সোমবার , ৩0 মার্চ ২0২0, Current Time : 7:04 am




অনিশ্চয়তায় ২০ হাজার পরিবার
বন্ধের পথে ইয়োলো ক্যাব ও উবার

সাপ্তাহিক আজকাল : 21/03/2020


মনোয়ারুল ইসলাম
ইয়োলো ক্যাব,উবার ও লিফট ড্রাইভারদের অর্থনৈতিক কান্নায় ভারি হয়ে উঠছে বাংলাদেশি কমিউনিটি। করোনা ভাইরাসের নামে তাদের জীবনে নেমে এসেছে আরেক সুনামি। এর কারনে এই পেশার মানুষের আয় এখন শূন্যের কোঠায়। গত ২ সপ্তাহ যাবৎ ড্রাইভাররা তাদের গাড়ির লিজ মানি (গাড়ির ভাড়া) তুলতে পারছেন না। শতকরা ৮০ ভাগ বাংলাদেশি ড্রাইভারই কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। কুইন্স ও ব্রুকলিনের প্রত্যেকটি ইয়োলো ক্যাবের গ্যারেজে শত শত গাড়ি অলস পড়ে আছে। কোন ড্রাইভার নেই। যারা লিজ নিয়ে গাড়ি চালান তারাও গ্যারেজে গিয়ে লিজ সারেন্ডার করছেন। কিন্তু বাঁধ সাধছেন মালিক পক্ষ। তারা বলছেন, গ্যারেজে গাড়ি রাখার মতো আর যায়গাও নেই। গাড়ি নিয়ে যান। লিজ রক্ষারও দরকার নেই। যদি কাজ করেন তবে আয়ের একটা অংশ ৩০% থেকে ৪০% আমাদের দিবেন। আয় না হলে কিছুই দিতে হবে না।
যে সব ড্রাইভারের নিজস্ব মেডালিয়ান রয়েছে তাদের প্রতি সপ্তাহে গুণতে হয় লিজের টাকা (ডলার)। উবার বা লিফট ড্রাইভারদের গাড়ির লিজ ও উচ্চমাত্রার ইন্সুরেন্স পেমেন্ট দিতে হয় প্রতিমাসে। সেটা কাজ হোক বা না হোক। এ ছাড়া তাদের বাড়ির মর্টগেজ বা বাসা ভাড়া, সংসার খরচ, টেলিফোন ও ইন্টারনেট, ইলেকট্রিক, গ্যাস এবং পানির বিলতো রয়েছেই। গড়ে প্রতিমাসে একজন ইয়োলো, উবার কিংবা লিফট ড্রাইভারের মাসিক সাংসারিক খরচ ৪ হাজার ডলার। করোনা ভাইরাসের কারনে আয় রোজগার শূন্যের কোঠায় ঠেকেছে। দৈনন্দিন আয়ের সাথে এ পেশার মানুষেরা করোনায়। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত না হয়েও অর্থনৈতিক সুনামিতে আক্রান্ত। অনেকে দেশেও দরিদ্র আত্মীয়-স্বজনকে সহায়তা করেন। প্রভাব পড়ছে সেখানেও।
নিউইয়র্ক সিটিতে অন্যান্য দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ সংখ্যক ইয়োলো ক্যাব ড্রাইভার বাংলাদেশি বংশোদ্ভুদ। টিএলসি’র তথ্যানুসারে মোট ৯৯৪০০ ইয়োলো ক্যাব ড্রাইভারের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি। এর পরের অবস্থানে পাকিস্তান ও ভারত। উবার ও লিফট ড্রাইভারের সংখ্যা মোট ৮০ হাজারের মতো। সেখানেও বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখ করার মতো। ফেডারেল গর্ভমেন্ট করোনা ভাইরাস নিয়ে বিশাল অংকের স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষণা করছে। সিনেটর মিট রমনী প্রত্যেক নাগরিককে ১ হাজার ডলার করে সাময়িক সহায়তা দেবার প্রস্তাব করেছেন। কিন্তু এসব অর্থ পেলেও তা হবে আমাদের এই কর্মজীবি ড্রাইভারদের জন্য সমুদ্রে এক ফোটা বৃস্টির পানির মতো। এ ক্ষেত্রে নিউইয়র্ক সিটি তথা টিএলসিকে এগিয়ে আসতে হবে। টিএলসি হচ্ছে নিউইয়র্ক সিটির ড্রাইভারদের প্রাতিষ্ঠানিক অর্গানাইজেশন। কিন্তু এখন পর্যন্ত টিএলসি কিংবা ড্রাইভারদের সংগঠনগুলোর কোনও আওয়াজ পাওয়া যায়নি। এ পেশার সাথে জড়িত রয়েছেন এমন কয়েকজন বাংলাদেশির কথোপকথন আজকালের পক্ষে তুলে ধরা হলো।

আবু তালেব চান্দু
আবু তালেব চান্দু কমিউনিটিতে পরিচিত মুখ। যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় পার্টির সাধারন সম্পাদক ও ইয়োলো ক্যাব ড্রাইভারদের পুরনো সংগঠন বেঙ্গল সোসাইটির উপদেষ্টা তিনি। ‘আজকাল’ পত্রিকার সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, ইয়োলো ক্যাব ড্রাইভাররা এমন পরিস্থিতির স্বীকার আর কখনো হননি। ৯১১ ঘটনায় কিছুদিন ইয়োলো ব্যবসার মন্দা ছিল। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে পরিস্থিতি ঘুরে দাঁঁড়াতে অনেক সময় লাগবে। তিনি ইয়োলো ও উবার ড্রাইভারদের পাশে আসার জন্য স্টেট ও নিউইয়র্ক সিটি তথা টিএলসিকে আহবান জানান।

মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান
নিউইয়র্কে বাংলাদেশি ইয়োলো ক্যাব চালকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন ‘ইয়োলো ক্যাব সোসাইটি’র সাধারন সম্পাদক মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমাদের সংগঠনের ৮০ ভাগ সদস্যই এখন আর কাজ করছেন না। কাজে যারা যাচ্ছেন তারা লিজ মানিও তুলতে পারেন না। বিশ্বব্যাপী এ সমস্যাকে আমরা পাশ কাটাতে পারি না। কিন্তু নিউইয়র্কে আমরা যারা গাড়ি চালাই তাদের সমস্যা ভয়াবহ। আমাদের গাড়িতে কারা উঠছেন তাদের চিনি না, জানি না। তাদের করোনা ভাইরাস আছে কিনা আমরা জানি না। ৪ জন প্যাসেঞ্জার গাড়িতে উঠলে একজন ড্রাইভারের পাশে এসে বসেন। তখন ড্রাইভারের কি অবস্থা হয় তা সবারই বুঝতে পারার কথা। নিজের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইয়োলো ট্যাক্সির মেডালিয়নটি আমার লোনে কেনা। প্রতি সপ্তাহে ব্রোকারকে পে করতে হয়। গাড়িরও কিস্তি আছে। আমার কিছু হলে পুরো পরিবারকে পথে বসতে হবে। গত সোমবার থেকে কাজ করছি না। ব্রোকারদের জানিয়ে দিয়েছি বর্তমান পরিস্থিতিতে পেমেন্ট দিতে পারবো না। এমন অবস্থা অনেকেরই। ড্রাইভারদের এ বিপদের দিনে সিটিকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে।

মাসুদ পারভেজ
মাসুদ পারভেজ আমেরিকায় প্রবাসী ৩০ বছরেরও অধিককাল ধরে। ড্রাইভিং পেশাতেই তার প্রবাস জীবনের কর্মময় জীবন শুরু। তা-ও ইয়োলো ক্যাব। জীবন সংগ্রামে এ পেশার আর পরিবর্তন করেননি। গত কয়েক বছর আগে উবার-লিফট ঝড়ে তার অনেক বন্ধু ইয়োলো ক্যাব ছাড়লেও পারভেজ এতেই লেগে ছিলেন। দুু:খ করে জনাব পারভেজ বলেন, ৯১১ এর সময়ও এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়িনি। গত শুক্রবার রাতে কাজ করতে বেড়িয়েছিলাম। তিন ঘন্টা ড্রাইভ করার পরও একজন প্যাসেঞ্জার না পাওয়ায় সোজা গ্যারেজে এসে গাড়ি জমা দিয়ে দেই। সিদ্ধান্ত নিয়েছি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আর ড্রাইভিং নয়। কিন্তু সামনে যা দেখছি তাতো অন্ধকার।

হাফিজুল বারী
জ্যাকসন হাইটসে কথা হলো ইয়োলো ক্যাব ড্রাইভার হাফিজুল বারীর সাথে। সদা হাস্যোজ্জল বারির মনটা খুবই খারাপ। তিনি বলেন, কাজ বন্ধ করে দিয়েছি শুক্রবার থেকেই। সারা রাত অমানসিক পরিশ্রম করে যদি লিজ মানিও তুলতে না পারি তাহলে কাজ করবো কেন? আমার ৩০ বছরের ড্রাইভিং জীবনে এমন দশা দেখিনি। সিচুয়েশন বেটার না হলে আর কাজ নয়। আমাদের মতো দৈনন্দিন কাজ করে যারা জীবন চালায় তারা মহা মুশকিলে পড়ে যাবে।

মমিনুর রহমান
মোহাম্মদ মমিনুর রহমান দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে নিউইয়র্কে বসবাস করছেন। ৯১১ ঘটনার সময়ও মানুষকে তিনি এতো আতঙ্কিত হতে দেখেননি। এবার মহামারি করোনা তা দেখাচ্ছে। বাজার ও গ্রোসারিতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। যেন মহাপ্রলয় আসন্ন। সব কিছু নিয়ে ঘরে ঢোকার প্রস্তুতি। উবার ব্যবসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যাত্রী কমে গেছে বহুগুণে। উবার গাড়ির সংখ্যাও হ্রাস পেয়েছে। যার কারনে উবার ড্রাইভাররা গত কয়েকদিন কিছু ব্যবসা করতে পারলেও রোববার থেকে সবকিছু যেন থমকে গেছে। সন্ধ্যার পর নিউইয়র্ক সিটি ভূতুড়ে নগরে পরিণত হয়েছে। সদা জাগ্রত টাইমস স্কয়ারকে মনে হয় মফস্বলের এক শহরের মতো।

গোলাম মোস্তফা
মোহাম্মদ মোস্তফা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসোসিয়েশন এলামনাই এসোসিয়েশন এর সাধারন সম্পাদক। বসবাস করেন ব্রঙ্কসে। আজকালের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, কিছু কিছু মানুষ সত্যিই ক্রেজি ভাব দেখাচ্ছে। বাজারে গিয়ে ৬ মাসের চাল কিনে আনছেন। ৯৯ সেন্টস এর হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনছেন ৬ ডলারে। অথচ এ বিকল্প হিসেবে সাবান ও লোশন ব্যবহার করা যায়। সতর্কভাবে চলাফেরা করলেই সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে। আতঙ্কিত হবার কিছু নেই। উবার, ইয়োলো ক্যাব ও গ্রীণ ক্যাব ব্যবসা প্রসংঙ্গে জানতে চাইলে জনাব মোস্তফা বলেন, আমার এক বন্ধু ইয়োলো ক্যাবে কাজ করেন। তার ভাষায় নাকি গাড়ি ভাড়ার টাকাও এখন ড্রাইভাররা তুলতে পারেন না। ইয়োলো ক্যাব তুলনামুলকভাবে কম পরিস্কার থাকায় যাত্রীরা উবারের দিকে ঝুঁকছেন। অধিকাংশ গ্যারেজে ইয়োলো ক্যাব পড়ে আছে। এক উবার ড্রাইভারের কাহিনী উল্লেখ করে মোস্তফা বলেন, একজন উবার ড্রাইভার কাশি দিয়েছিলেন। যাত্রী আশঙ্কিত হয়ে উবারের অ্যাপসে কমেন্ট লিখেছে ‘করোনার আশংকা’ প্রকাশ করে। সাথে সাথে উবার ড্রাইভারের অ্যাপস বন্ধ করে দিয়ে পরামর্শ দিয়েছে ডাক্তার দেখাতে। ড্রাইভার হয়ে পড়লেন বেকার। অবশ্য ডাক্তার অবশ্য তার তেমন কিছুই পায়নি। রিপোর্ট দেবার কয়েকদিন পর অ্যাপস চালু হয়েছে। কিন্তু ভোগান্তিতো ড্রাইভারের কম হয়নি।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: [email protected]
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.