বৃহস্পতিবার , ১৪ নভেম্বর ২0১৯, Current Time : 1:32 am




সাপ্তাহিক আজকাল : 02/11/2019

অল রাউন্ডার সাকিবের
জন্য কাঁদছে বাংলাদেশ

আনিস রায়হান, ঢাকা থেকে
২৯ অক্টোবর, মঙ্গলবার ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি দিন। অনেক জল্পনা, কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সেদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা (আইসিসি) বাংলাদেশের অধিনায়ক সাকিব আল হাসানকে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে। এর মাঝে এক বছর স্থগিত নিষেধাজ্ঞা, অর্থাৎ নিয়ম নীতি মেনে চললে মূলত এক বছরের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকতে হবে সাকিবকে। দুর্নীতিবিরোধী নীতিমালা লঙ্ঘনের অপরাধে সাকিবকে এ শাস্তি দেয় আইসিসি। এ ঘোষণার পর সারা বাংলাদেশের মানুষ মুষড়ে পড়ে। দেশের ক্রিকেটাঙ্গনের সবচেয়ে বড় তারকাকে আইসিসির এত বড় শাস্তি দেয়াটা নিতে পারছে না অনেকে। অবশ্য বাংলাদেশের টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক এর দায় মেনে নিয়েছেন। আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিটের কাছে তথ্য না জানানোয় এ শাস্তি পেয়েছেন সাকিব। ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ করলে স্থগিত এক বছরের নিষেধাজ্ঞাও কার্যকর হবে।
বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে ২ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করল আইসিসি। এমন খবর পেয়ে মিরপুর শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে জড়ো হয় সাকিব ভক্তরা। সাকিবকে মাঠে দেখতে চায় সবাই। কারো মুখে শ্লোগান, কেউ বাকরুদ্ধ, মানুষ কাঁদছে আর বলছে, ‘নো সাকিব, নো ক্রিকেট’। ক্ষুব্ধ এক ভক্ত বলেন, নো সাকিব, নো ক্রিকেট- সাকিব না থাকলে ক্রিকেট দেখব না, বয়কট করলাম। শুভ নামের এক ভক্ত এসেছিলেন প্ল্যাকার্ড হাতে। তিনি বলেন, দুই বছর পর কেন ইস্যুটা এলো। আমরা মনে করছি অন্যদের প্রভাব আছে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। সাকিব নেই, তো ক্রিকেটও নয়।
দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের খেলা যেখানেই হোক বাঘ সেজে হাজির হন শোয়েব। সেই শোয়েব কাঁদছিলেন স্টেডিয়ামের সামনে। শোয়েব বলেন, বলার ভাষা আমার নেই। আমি না, সব সমর্থকেরই আজ একই অবস্থা। এক বছর যে সাকিব ভাই মাঠে থাকবেন না, তা মেনে নিতে পারছি না। এটা অপরাধ না, এটা একটা ভুল। একটা ভুলের কারণে আইসিসি এ ধরনের শাস্তি দেবে, তা মানা যায় না। সবার উচিৎ আইসিসির সাথে কথা বলা। ধারণা করা হচ্ছে, বিসিবির অনুরোধে হয়তো শাস্তি কিছুটা কমতে পারে। তবে আগামী এক বছর সাকিবের ওপর কড়া নজরদারি করা হবে। কিছু ব্যত্যয় হলেই নিষেধাজ্ঞা এক থেকে দুই বছর হয়ে যাবে। সাকিব অবশ্য আইসিসিকে সব ধরনের সহযোগিতা করাসহ তাদের আদেশ, আজ্ঞা মেনে চলার ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায়ও এ নিয়ে দেখা গেছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। সব শ্রেণী ও পেশার মানষিদের মধ্য থেকেই প্রতিক্রিয়া পাওয়া গছে। সবাই মনে করেন, আইসিসি লঘু পাপে সাকিবকে গুরুদন্ড দিয়েছে। ভক্তরা এরসঙ্গে এমনকি ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের দায়ও দেখছেন। বিসিবি সাকিবের পক্ষে শক্তভাবে দাঁড়াচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের। কেউ কেউ আবার মনে করেন, এটা বাংলাদেশ ক্রিকেটকে ধ্বংস করার একটা ষড়যন্ত্র ছিল, ভারতের ওই জুয়াড়ি ভারতীয় কোনো ষড়যন্ত্রেরই অংশীদার। তবে অনেকেই আহবান জানাচ্ছেন, এরকম আবেগ দিয়ে বিষয়টিকে বিচার না করে বরং ক্রিকেটারদের আরো দায়িত্বশীল হওয়ার আহবান জানাতে।
সাকিবের পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের ক্রীড়াঙ্গনের বিভিন্ন খেলার সঙ্গে যুক্ত তারকারাও। ক্রিকেট দলের সাবেক ও বর্তমান, অধিকাংশ খেলোয়াড়রাই তার নিষেধাজ্ঞা কমানোর আর্জি করেছেন। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে মুশফিকুর রহিম ২০১২ এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অল্পের জন্য হেরে যাওয়ার পর সাকিবকে জড়িয়ে ধরে কান্নার সেই মুহূর্ত পোস্ট করে লিখেছেন, বয়স ভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একসঙ্গে ১৮ বছর খেলার পর…, মাঠে তোমাকে ছাড়া খেলার কথা ভাবা খুবই কষ্টদায়ক। আশা করি, তুমি চ্যাম্পিয়নের মতো ফিরে আসবে। তোমার প্রতি আমার এবং পুরো বাংলাদেশের সমর্থন রয়েছে। ভেঙে পড়ো না, ইনশাল্লাহ।
সাকিবের বিরুদ্ধে আইসিসির দুর্নীতি দমন আইনের ২.৪.৪ ধারার অধীনে তিনটি অভিযোগ তোলা হয়েছে। ১) ২০১৮ সালে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ের মধ্যকার ত্রিদেশীয় সিরিজ ও ২০১৮ সালে আইপিএলের সময় জুয়াড়িদের কাছ থেকে পাওয়া প্রস্তাবের কথা আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিটের (এসিইউ) কাছে জানাননি সাকিব। ২) ২০১৮ সালের ত্রিদেশীয় সিরিজেই তাঁর সঙ্গে জুয়াড়িরা দ্বিতীয়বার যোগাযোগ করলেও সেটিও এসিইউর কাছে বিস্তারিত জানাতে ব্যর্থ হয়েছেন সাকিব। ৩) ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল সানরাইজার্স হায়দরাবাদ ও কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের একটি ম্যাচের আগে সাকিবকে ম্যাচ পাতানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেটিও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।
জানা যায়, দীপক আগারওয়াল নামের এক জুয়াড়ির কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়েছিলেন সাকিব। তার প্রস্তাবে তিনি রাজি হননি। জুয়াড়ির চাওয়া অনুযায়ী দলের ভেতরের কোনো তথ্য দেননি। ম্যাচও পাতাননি। তবুও তার অপরাধ, কেন বিষয়টি আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিটকে জানাননি। ঘটনার শুরু ২০১৭ সালের নভেম্বরে, যেটি চলতে থাকে ২০১৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। দুটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও একটি আইপিএলের ম্যাচ, এই তিন-তিনটি ম্যাচের আগে জুয়াড়ি দীপকের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়েছেন। হোয়াটসঅ্যাপে নানা কথাবার্তা চালাচালি হয়েছে দুজনের। নিজেও একটা সময় আবিষ্কার করেছেন, এই দীপক পাকা জুয়াড়ি। তবুও তিনি চুপ থাকলেন।
আইসিসির দুর্নীতি দমনের আইন খুব ভালো করেই জানেন সাকিব। আইসিসির বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি বিরোধী কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। এমনকি ১০-১১ বছর আগেও যখন জুয়াড়িদের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়েছেন, আকসুকে জানাতে দুবার ভাবেননি। অথচ পরিণত সাকিব, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক যুগের বেশি সময় কাটিয়ে দেওয়ার পর, এরকম একটি বিষয় আকসুকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি! তাও এমন একজন জুয়াড়ির প্রস্তাব, যিনি আইসিসির কালো তালিকাভুক্ত! অথচ এটা সবাই মনেন যে, বুদ্ধিমত্তায় বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে এগিয়ে থাকা ক্রিকেটার হচ্ছেন সাকিব। তার চাপ সামলানোর ক্ষমতা সব সময়ই মুগ্ধ করে। সস্তা আবেগে তিনি ভেসে যান না। কাউকে তোষণ করে চলেন না। তিনি এমন ভুল করবেন, এটা কেউ মেনে নিতে পারছে না।
খেলার বিশেষজ্ঞরা অবশ্য মনে করছেন, সাকিব ভীষণ সাহসী, আত্মবিশ্বাসী এবং যেকোনো বিষয়ে অকপট। দ্বিধায় ভোগেন খুবই কম। যেটা ভাবেন দুম করে সেটিই করে ফেলেন। সাকিব হচ্ছেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক ক্রিকেটার। নিজের প্রতিভা, পরিশ্রম, চেষ্টা আর সামর্থ্যরে সফল প্রয়োগে গত ১৩ বছরে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপণ হিসেবে। এসব অর্জন তার মধ্যে এক ধরনের ‘ডোন্ট কেয়ার’ মনোভাবের জন্ম দিয়েছে। নিজের ওপর তার অগাধ আস্থা, আত্মবিশ্বাস আর সততা থেকে মনে করেছেন, তিনি নিজে দুর্নীতি না করলেই হলো। আইসিসিকে কিছু না জানালে কিছু হবে না, কারণ তিনি নিজে তো দুর্নীতি করননি। এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই তাকে ডুবিয়েছে।
সাকিব বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আস্থার জায়গা। ফলে তিনি ডুবলে তার দুর্ভোগ দরকেই বইতে হবে। ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবরের আগে আর ক্রিকেট মাঠে ফিরতে পারছেন না সাকিব। যার অর্থ হলো, সাকিবকে ছাড়াই আগামী বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম পর্বে খেলতে হবে বাংলাদেশকে। এর মধ্যে আছে পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ। মোট ৩৬টি ম্যাচে সাকিবকে পাবে না বাংলাদেশ। স্থানীয় ক্রিকেটেও খেলতে পারবেন না তিনি। ফলে নিষেধাজ্ঞা শেষেও কিছুদিন অনুশীলনের মধ্য দিয়ে নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিতে হবে। দেশবাসীর আশাবাদ, সব বিপদ কাটিয়ে সাকিব দ্রুতই আবার বাংলাদেশ ক্রিকেটের হাল ধরবেন।
এদিকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় নায়িকা মৌসুমীসহ অনেকেই কাঁদছেন তাদের প্রিয় ক্রিকেটার সাকিবের জন্য।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: [email protected]
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.