সোমবার , ১৮ নভেম্বর ২0১৯, Current Time : 2:35 am




জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থীদের আতঙ্কে মুসলিমরা

সাপ্তাহিক আজকাল : 19/10/2019

আজকাল ডেস্ক
জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ২০১৮ সালে ৯১০টি ইসলাম বিদ্বেষী হামলার ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে। সংখ্যাটি ২০১৭ সালের তুলনায় কিছুটা কম। সে বছর এই ধরনের ১০৭৫টি অপরাধের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছিল। যদিও মুসলমানদের উপর সরাসরি হামলা আগের চেয়ে ক্রমশ বাড়ছে। ২০১৭ সালে যেখানে এ ধরনের হামলায় ৩২ জন আহত হয়েছিল, ২০১৮ সালে তা বেড়ে ৪০ জনে পৌঁছেছে।
মুসলিমদের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল মনে করে এই সংখ্যা দিয়েও ঠিক বাস্তবতা বোঝা যাবে না। কেননা অপরাধের সব ঘটনা পরিসংখ্যানে আসে না। হামলার শিকার যারা হয় তাদের একটি বড় অংশই সেগুলো প্রকাশ করেন না। আবার পুলিশ এবং তদন্তকারীরা কিছু অপরাধ ভুলভাবে শ্রেণীভুক্ত করে। এর ফলেও ইসলাম বিদ্বেষী অনেক ঘটনা বাদ যায়। এমনটাই বলা হয়েছে স্থানীয় আঞ্চলিক গণমাধ্যম ‘নয়ে অসনাব্রুকার সাইটুং’-এর এক প্রতিবেদনে।
গত ৯ অক্টোবর জার্মানির পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত হালে শহরে ইহুদিদের উপাসনালয়ে একটি হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাটি যখন ঘটে সিনাগগ বা ইহুদি উপাসনালয়ে তখন প্রার্থনা চলছিল। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে, হেলমেটে ক্যামেরা লাগিয়ে হত্যালীলা চালানোর প্রস্তুতিই হয়তো নিয়ে এসেছিল আততায়ী। কিন্তু বন্ধ দরজার উপর বিস্ফোরক নিক্ষেপ করেও সফল হতে পারেনি ঐ ব্যক্তি। সিনাগগের নিজস্ব নিরাপত্তারক্ষীরা সেই হামলা প্রতিহত করে। ভিতরে ঢুকতে ব্যর্থ হয়ে দুই পথচারীকে হত্যা করে সে। পালানোর সময় হামলাকারী ধরা পড়ে পুলিশের হাতে।
এই হামলার ঘটনায় মর্মাহত হয়েছে দেশটির মুসলিমরা। সেখানে বসবাসরত মুসলমানদের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল এই ঘটনায় ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। মুসলিমরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও। ইহুদিদের সিনাগগের উপর হামলার ঘটনাটি খুব একটা বিস্ময়কর ছিল না আয়মান মাজাইকের কাছে। এমন কিছু ঘটতে পারে তা আন্দাজ করতে পারছিলেন সেখানে বসবাসরত মুসলিমদের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। তার মতে যেই ঘটনাটি ইহুদিদের সাথে ঘটেছে তার শিকার হতে পারত সেখানকার মুসলিমরাও। কেননা ইহুদি আর মুসলিম দুই সম্প্রদায়কেই একই নজরে দেখে দৃর্বত্তরা। এজন্য তাদের একে অন্যকে সহযোগিতা করা উচিৎ বলে মনে করেন তিনি। মাজাইক নিজে ঘটনার পরে হালের ইহুদিদের সাথে দেখা করেছেন, জানিয়েছেন সহমর্মিতা।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে উপাসনালয়ে হামলার শিকার হয়েছেন এই শহরের মুসলিমরাও। মুসলিমরা মনে করেন পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি হচ্ছে। এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে যে, অপরাধীরা এখন আর মুখে কিছু বলে দমে যাচ্ছে না, তারা চায় সরাসরি আক্রমণ করতে। উগ্র ডানপন্থী কিছু সন্ত্রাসীর আচরণ এখন অনেকটা ক্রাইস্টচার্চের ঘটনার মতো। তারা তাদের ম্যানিফেস্টোতে জানান দিয়েছে, আর সেখান থেকে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হয়ে একই ঘটনার অনুকরণ করছে। কাজেই এটা এক ধরনের ঘোষণা দিয়ে আসা বিপর্যয়ই বলা যায়, যা আসলেই ভয়ংকর।
এরোফোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ইসলাম বিশেষজ্ঞ কাই হাফেজের এক গবেষণায় দেখা গেছে ৫০ ভাগেরও বেশি জার্মান ইসলামভীতি পোষণ করেন। থিউরিংগিয়া এবং স্যাক্সোনির মতো কিছু অঞ্চলে এই হার ৭০ ভাগ বা তার চেয়েও বেশি। এক সময় প্রবণতাটি সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ে থাকলেও এখন তা ছড়িয়ে পড়ছে বিস্তৃতভাবে। জার্মান ‘অ্যান্টি ডিসক্রিমিন্যাশন অ্যাসোসিয়েশন’ এর সদস্য বিয়ার্তে ভাইসও বিষয়টি স্বীকার করেন। প্রতিদিনই মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাব বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি।
একজন জার্মান মুসলিম গণমাধ্যমকে তার অভিজ্ঞতা বোঝাতে গিয়ে বলেন, থুতু দেয়া বা কড়া দৃষ্টিতে তাকানোটা সাধারণ ব্যাপার। এগুলো তেমন ক্ষতিকর অভিজ্ঞতা নয় বরং রাস্তা ঘাটে এখন আমাদেরকে প্রায়ই মৌখিক ও শারীরিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়। সহনশীলতার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমশ, বাড়ছে বর্ণবাদী নিন্দা কিংবা অপমান করার প্রবণতা। এই পরিস্থিতির মুখোমুখি এখন মুসলিম আর ইহুদি দুই পক্ষই। সংখ্যাগরিষ্ঠের চেয়ে যারাই আলাদা তারাই এমন আচরণের শিকার হচ্ছে।
অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে, শিশু ও নারীরা এখন মসজিদে আসতে ভয় পায়। শুক্রবারের প্রার্থনায় যাওয়ার সময় তারা বিচলিত বোধ করে। অনেকে আবার ভয়ে মসজিদে আসাও ছেড়ে দিচ্ছে। তিনি মনে করেন জনগণের স্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তার অধিকার রক্ষার জন্য পরিচিত একটি দেশে এমন পরিস্থিতি চলতে পারে না। আর সেদিক থেকে হালে শহরে ইহুদিদের সিনাগগের উপর হামলাকে দেখা হচ্ছে ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা সন্ধিক্ষণ হিসেবে।
২০১৮ সালের ২৬ আগস্ট কেমনিৎসে ছুরিকাঘাতে এক জার্মান নাগরিক নিহত হন। এই হত্যাকা-ের জন্য ওই সময় একজন বিদেশিকে সন্দেহ করা হয়েছিল। ওই হত্যাকা-ের পর কেমনিৎস শহরে এক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ হয়। এ সময় উগ্র ডানপন্থিদের রাস্তায় অভিবাসী ও বিদেশিদের ধাওয়া করতে দেখা যায়। কেমনিৎসে বিক্ষোভের তদন্ত করে পুলিশ বলছে, ওই সময় চরম ডানপন্থি ব্যক্তিরা অভিবাসী এবং বিদেশিদের চিহ্নিত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। সম্প্রতি ২৩ বছর বয়সী এক সিরিয়ান নাগরিককে ওই হত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এতা মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য বোঝা হয়ে উঠেছে।
দুশ্চিন্তা আরো বাড়ছে, যখন জানা যাচ্ছে যে, জার্মানির সামরিক বাহিনীর এলিট ইউনিট ‘কমান্ডো স্পেৎসিয়ালক্র্যাফ্টে’ বা কেএসকে-র অনেক সদস্য উগ্র ডানপন্থি মতাদর্শের সমর্থক। আবার রাজনীতিবিদরাও এগোচ্ছেন সেই পথেই, ইইউ নির্বাচনে উগ্রপন্থী রাজনীতিকরা বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে। এ অবস্থায় উগ্র ডানপন্থার রাশ টেনে ধরতে একজন কমিশনার নিয়োগ, বিভিন্ন পক্ষের সাথে আলোচনা শুরুর পাশাপাশি নিরাপত্তায় বিনিয়োগ এবং চূড়ান্ত অর্থে মুসলিম বিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: [email protected]
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.