বৃহস্পতিবার , ১৪ নভেম্বর ২0১৯, Current Time : 2:32 am




আরেক বাঙালির নোবেল জয়

সাপ্তাহিক আজকাল : 19/10/2019

আজকাল ডেস্ক
অমর্ত্য সেনের পর দ্বিতীয় বাঙালি হিসেবে অর্থনীতিতে নোবেল জিতেছেন কলকাতা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। অবশ্য বাঙালি নোবেলবিজয়ীদের মধ্যে তার অবস্থান চতুর্থ। অন্যদিকে কলকাতাভিত্তিক নোবেল বিজয়ীদের মধ্যে তার অবস্থান ষষ্ঠ। অভিজিতের নোবেল বিজয়ে ভারত, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে আনন্দ উদযাপন চলছে। যদিও ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী শাসকদল বিজেপির কিছু কর্মকা-ের বিরোধিতা করায়, বিজেপি নেতৃবৃন্দ ও তাদের সরকার অভিজিতের এ সাফল্য নিয়ে প্রায় নিশ্চুপ।
কলকাতার সন্তান অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জির সঙ্গে চলতি বছর অর্থনীতিতে নোবেল জিতেছেন তার স্ত্রী এসথার ডুফলো এবং মাইকেল ক্রেমার। দ্যা রয়েল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস বৈশ্বিক দারিদ্র বিমোচনে তাদের পরীক্ষা নিরীক্ষার দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এই তিনজন অর্থনীতিবিদের গবেষণা দারিদ্রের সাথে লড়াইয়ের সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। একাডেমি বলছে, মাত্র দু’দশকে তাদের নতুন নিরীক্ষা ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকসে রূপ নিয়েছে, যা এখন গবেষণার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে বিকশিত হচ্ছে।
অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি পড়াশোনা করেছেন ভারতের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৮১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৮৩ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ১৯৮৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন হার্ভার্ড এখন কাজ করছেন ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি, যা এমআইটি নামে বিশ্বে বহুলভাবে পরিচিত। সেখানে তিনি ফোর্ড ফাউন্ডেশন ইন্টারন্যাশনাল প্রফেসর হিসেবে অর্থনীতি পড়াচ্ছেন। ২০০৩ সালে তিনি এসথার ডুফলো ও সেন্ধিল মুল্লাইনাথানকে সাথে নিয়ে আব্দুল লতিফ জামিল পোভার্টি অ্যাকশন ল্যাব প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অভিজিৎ ব্যানার্জি জন্মগ্রহণ করেছেন ১৯৬১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি।
অভিজিতের আগে বাঙালিদের মধ্যে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন অমর্ত্য সেন। কল্যাণ অর্থনীতিতে মৌলিক অবদানের জন্য ১৯৯৮ সালে নোবেল জয় করেন। ভারতীয় এ বাঙালী নাগরিক দুর্ভিক্ষ, মানব উন্নয়ন তত্ত্ব, জনকল্যাণ অর্থনীতি ও গণদারিদ্রের অন্তর্নিহিত কার্যকারণ বিষয়ে গবেষণা এবং উদারনৈতিক রাজনীতিতে অবদান রাখার জন্য ১৯৯৮ সালে তিনি অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে ব্যাংক অফ সুইডেন পুরস্কার লাভ করেন। এটিই লোকমুখে অর্থনীতির নোবেল পুরস্কার হিসেবে পরিচিত। যা এবার দুই সহযোগীর সঙ্গে ভাগ করে নিলেন অভিজিৎ।
বাঙালিদের মধ্যে প্রথম নোবেল পান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অবশ্য বাংলা নয় ইংরেজী দক্ষতাকেই তার নোবেলের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া হয়। ১৯১৩ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গীতাঞ্জলী কাব্যগ্রন্থের ইংরেজী অনুবাদের কারণে সাহিত্যে নোবেল পান। তার কাব্যের অতি উচ্চমানের সংবেদনশীল, পরিশুদ্ধ ও সৌন্দর্য্যম-িত পংক্তির জন্য, যার মাধ্যমে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তার কাব্যিক চিন্তা-চেতনা নিজস্ব ইংরেজি শব্দে প্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছেন, যা পশ্চিমা সাহিত্যেরই একটি অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। নোবেলের ফলে তিনি পুরো বিশ্বের কাছেই এক অলংকার রূপে আর্বিভূত হয়েছেন।
অন্যদিকে অভিজিতের আগে সর্বশেষ বাঙালি যিনি নোবেল বিজয়ী হয়েছেন, তিনি বাংলাদেশের ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস। এই ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন শিক্ষক। তিনি ক্ষুদ্রঋণ ধারণার প্রবর্তক। অধ্যাপক ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকেরও প্রতিষ্ঠাতা। মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
কলকাতাভিত্তিক নোবেল বিজয়ী অবশ্য কেবল বাঙালিরাই নন। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী আরো তিনটি নোবেল সাফল্যের অংশীদার। চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন ছিলেন এশিয়ার প্রথম ব্যক্তি যিনি বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছিলেন। ১৯৩০ সালে পদার্থ বিদ্যায় নোবেল পেয়েছিলেন তিনি। মাদ্রাসের প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর ১৯১৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯০৭ সাল থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত মোট ২৬ বছর তিনি যুক্ত ছিলেন কলকাতার বউবাজারস্থিত ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর কাল্টিভেশন সায়েন্স-এর সঙ্গে। এখানেই আবিষ্কার হয় তাঁর বিখ্যাত ‘রমন এফেক্ট’।
মাদার তেরেসা সুদূর ইউরোপের আলবেনিয়াতে জন্মগ্রহণ করলেও সমাজসেবী মাদার তেরেসা তার সম্পূর্ণ জীবন সমাজের কল্যাণে উজাড় করে দিয়েছেন কলকাতা থেকেই। কলকাতাভিত্তিক এই কাজের জন্যই নোবেল শান্তি সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৫০ সালে কলকাতায় তিনি দ্য মিশনারিজ অফ চ্যারিটি (দাতব্য ধর্মপ্রচারক সংঘ) নামে একটি খ্রিস্ট ধর্মপ্রচারণাসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১২ সালে এই সংঘের সাথে যুক্ত ছিলেন ৪৫০০ সন্ন্যাসিনী। প্রথমে ভারতে ও পরে সমগ্র বিশ্বে তার এই ধর্মপ্রচারণা কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৬ সালে পোপ ফ্রান্সিস তাকে ‘সন্ত’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন এবং ক্যাথলিক গির্জায় তিনি ‘কলকাতার সন্ত টেরিজা’ হিসেবে আখ্যায়িত হন। আরেক বিজ্ঞানী রোনাল্ড রস ম্যালেরিয়া নিয়ে তার গবেষণার জন্য ১৯০২ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান। তিনিই প্রথম দেখান কি করে ম্যালেরিয়া ছড়ায়। বিদেশে জন্ম নিলেও ১৮৯৮ সালে ব্রিটিশ আমলে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। তার সমস্ত গবেষণার কেন্দ্র ছিল কলকাতা।
বাঙালি অভিজিতের নোবেল বিজয় ভারত রাষ্ট্রের জন্য গর্বের হলেও ভারতের ক্ষমতাসীন সরকার যেন এ নিয়ে কিছুটা বিব্রত। বিজেপি শিবিরে হতাশার কারণ এই যে, এত দিন এক নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাদের বিরোধিতা করে আসছিল, সেটা সামলাতেই অবস্থা জেরবার। এখন আরেক সমালোচক যুক্ত হলেন সেই তালিকায়। শুধু বিজেপিকে সমালোচনাই নয়, লোকসভা ভোটের আগে রাহুল গান্ধীর ‘ন্যায়’ প্রকল্প তৈরিতে সাহায্য করেছিলেন অভিজিৎ। নোবেল পাওয়ার ক’দিন আগেও ভারতের অর্থনীতি ও প্রধানমন্ত্রীর দফতরের প্রভাব নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন অভিজিৎ। এমনকি নোবেল পাওয়ার পরও তিনি বলেছেন, ‘ভারতীয় অর্থনীতির হাল খুব খারাপ। অর্থনীতির গতি দ্রুত হারে শ্লথ হচ্ছে। সরকারও সেটা বুঝছে।’ এসব কারণে খবর আসার প্রায় ঘণ্টা চারেক পর মোদি এক শীতল প্রতিক্রিয়ায় অভিজিৎকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: [email protected]
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.