রবিবার, ২0 অক্টোবর ২0১৯, Current Time : 5:12 am
  • হোম » জাতীয় » ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে উত্তাল শিক্ষাঙ্গন




ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে উত্তাল শিক্ষাঙ্গন

সাপ্তাহিক আজকাল : 09/10/2019

আবরার ফাহাদের খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধসহ আট দফা দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। তবে দিনভর আন্দোলনের পর গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু সেখানে তাঁদের দাবি মানার ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না দেওয়ায় তোপের মুখে পড়েন উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে প্রায় চার ঘণ্টা উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। আজ বুধবার সকাল থেকেই আবারও আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়ে উপাচার্য কার্যালয়ের তালা খোলেন শিক্ষার্থীরা। তবে তাঁদের দাবির সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা একাত্মতা প্রকাশ করেছে। এমনকি দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছে শিক্ষার্থীরা।

গতকাল রাত পৌনে ১০টায় দ্বিতীয় দিনের মতো আন্দোলন স্থগিত করেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনরত ১৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী সৌমেন সিকদার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা বুধবার সকাল ১০টা থেকে বুয়েটের শহীদ মিনারের সামনে জড়ো হব। তবে আমাদের দাবিতে কিছু পরিবর্তন আসবে। সেটা বুধবার ঘোষণা করা হবে। তবে আমাদের দাবি মানার আগ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানাচ্ছি। আমরা উপাচার্য কার্যালয়ের তালা খুলে দিয়েছি। তিনি ইচ্ছা করলে চলে যেতে পারেন।’    গতকাল সকাল থেকে বুয়েট ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। প্রথমে তাঁরা বুয়েট শহীদ মিনারে জড়ো হন। পরে তাঁরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করে আট দফা দাবির কথা জানান। তবে দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে গায়েবানা জানাজায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। এরপর তাঁরা প্রতীকী লাশ নিয়ে মিছিল করে পলাশী হয়ে বুয়েট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।

শিক্ষার্থীদের আট দফা দাবিগুলো হলো—খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে শনাক্তকারী খুনিদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবন বহিষ্কার। দায়ের করা মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্বল্পতম সময়ে নিষ্পত্তি এবং নিয়মিত ছাত্রদের আপডেট জানানো। ঘটনার ৩০ ঘণ্টা পরও উপাচার্য কেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি মঙ্গলবার বিকেল ৫টার মধ্যে ক্যাম্পাসে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে এর জবাব দেওয়া। আবাসিক হলগুলোতে র‌্যাগের নামে এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করা। ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থ হওয়া শেরেবাংলা হলের প্রভোস্টকে আগামী শুক্রবার বিকেল ৫টার মধ্যে প্রত্যাহার। আবরার হত্যা মামলার সব খরচ ও তাঁর পরিবারকে ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে বুয়েট প্রশাসনের দায়িত্ব নেওয়া। শেষ দাবিতে বুয়েটে সাংগঠনিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি করেছে শিক্ষার্থীরা। রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে বুয়েটের হলে হলে ত্রাসের রাজনীতি কায়েম করে রাখা হয়। জুনিয়র ব্যাচকে সব সময় ভয়ভীতি দেখিয়ে মিছিল-সমাবেশে নেওয়া হয়। যেকোনো সাধারণ শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। হলে হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। তাই ১৫ অক্টোবরের মধ্যে সব রাজনৈতিক সংগঠন এবং এর কার্যক্রম অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিষিদ্ধ করা।

শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা জানান বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক অধ্যাপক মিজানুর রহমান। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তিনি ক্যাম্পাসে এলে আন্দোলনকারীরা তাঁকে ঘিরে ধরেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি জানান।

অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমি মনে করি, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন নেই।’ এ সময় শিক্ষার্থীরা করতালি দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান।

বুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে আলোচনার পর অধ্যাপক মিজানুর রহমান গতকাল বিকেলে ছাত্রদের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিকে উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠকের আহ্বান জানান। তবে শিক্ষার্থীরা সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেন। এরপর শিক্ষার্থীরা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র না দেওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব কার্যক্রম বন্ধ রাখা এবং আগামী ১৪ অক্টোবরের বুয়েটের প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা বন্ধ রাখারও দাবি জানান।

গতকাল বিকেল ৫টার পর শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে বুয়েটের ফটক, উপাচার্যের কার্যালয়, একাডেমিক ভবন ও প্রশাসন ভবনে তালা লাগিয়ে দেন। তাঁরা জানান, আংশিক কোনো দাবি মানা হবে না।

তবে বেঁধে দেওয়া সময়ের পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে উপাচার্য তাঁর কার্যালয়ের সামনে আসেন। এ সময় সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাঁকে ঘিরে ধরেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে এসে উপাচার্য বলেন, ‘আমি তোমাদের অভিভাবক, তোমরা আমার সন্তান। আবরারের সঙ্গে যা ঘটেছে সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত।’ এ কথা শোনার পর শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তাঁরা বলেন, ‘এটা একটা খুন, আপনাকে স্বীকার করতে হবে।’

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শান্ত হলে উপাচার্য বলেন, ‘আমি শিক্ষামন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। মন্ত্রী দেশের বাইরে আছেন। সেখান থেকে তাঁরা যেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছেন, আমি তা পালন করছি। আমি তোমাদের দাবিগুলো দেখেছি। এসব নিয়ে তোমাদের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা হয়েছে। আবরার হত্যায় জড়িতদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুসারে বহিষ্কার করা হবে। তোমাদের দাবিগুলোর সঙ্গে নীতিগতভাবে আমরা একমত। তবে আমার হাতে সব ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা অনুযায়ী তোমাদের দাবিগুলো মেনে নেব।’

এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী উত্তেজিত হয়ে উপাচার্যকে বলেন, ‘আবরার খুন হওয়ার পর আপনি কই ছিলেন? সোমবার কেন এখানে আসেননি?’ উপাচার্য বলেন, ‘আমি এখানেই ছিলাম। আমি রাত দেড়টা পর্যন্ত কাজ করেছি।’

এই বলে উপাচার্য চলে যেতে চাইলে শিক্ষার্থীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। এরপর শিক্ষার্থীরা উপাচার্য কার্যালয়ের নিচে তাঁকে কিছু সময়ের জন্য অবরুদ্ধ করে রাখেন। উপাচার্যের সঙ্গে বুয়েটের বিভিন্ন বিভাগের ডিন ও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। গতকাল রাত পৌনে ১০টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা উপাচার্য কার্যালয় অবরুদ্ধ করে অবস্থান নেন।

এদিকে বুয়েট ছাত্রলীগের উপ-আইন সম্পাদক অমিত সাহাকে আটক না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাঁরা জানান, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের বহিষ্কারের তালিকায় অমিতের নাম নেই। মামলায়ও তাঁর নাম নেই। অথচ তিনি আবরার হত্যার সঙ্গে জড়িত। তাঁকে কোনোভাবে বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

১৭ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করে বলেন, হলগুলোতে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার মধ্যে থাকতে হয়। কোনো বিষয় নিয়ে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়ে কোনো লাভ হয় না। বাধ্য হয়ে অনেকে হলও ছেড়ে দেন। সবাই আসলে অসহায় তাদের কাছে।

আর্কিটেকচার বিভাগের ১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী বান্না বলেন, কোনো ঘটনা ঘটলে প্রশাসন বিচারের আশ্বাস দেয়; কিন্তু বিচার হয় না। আসলে তারা কিছু করতে পারে না। রাজনীতি থাকলে এই ধরনের অত্যাচার চলতেই থাকবে। অত্যাচারের শিকড় উপড়ে ফেলতে বুয়েটে ছাত্রসংগঠনগুলোর রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হোক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গায়েবানা জানাজা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে আবরার ফাহাদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল দুপুরে রাজু ভাস্কর্যের সামনের এই জানাজায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেয়। বিচারকাজে কোনো অবহেলা হলে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা। তাঁরা আববারকে শহীদ হিসেবে অবহিত করে।

অভিভাবক হিসেবে আমরা ব্যর্থ : আবরার ফাহাদের কথা বলে কাঁদলেন বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ কে এম মাসুদ। তিনি গতকাল বুয়েট শহীদ মিনারে শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচিতে এসে বলেন, ‘আমরা অভিভাবক হিসেবে ব্যর্থ হয়েছি। আবাসিক হলে কোনো শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যাবে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আবরার হত্যা প্রমাণ করছে কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। খুনিরা আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি পাবে, আমরা এটা চাই।’

ঢাবি শিক্ষক সমিতির বিবৃতি : আবরার হত্যার ঘটনায় ক্ষুব্ধ, ব্যথিত ও মর্মাহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করে হত্যাকারীদের দ্রুততম সময়ে বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। গতকাল সমিতির সভাপতি ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. তাজিন আজিজ চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই দাবি জানায় শিক্ষক সমিতি।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: [email protected]
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.