বৃহস্পতিবার , ১৪ নভেম্বর ২0১৯, Current Time : 2:37 am




কথা বলা ব্যাঙ ও এডিস মশা

সাপ্তাহিক আজকাল : 24/08/2019

গোলাম মোর্তোজা :
যে ব্যাঙ বলেছিল, ‘হে শিশুরা তোমাদের কাছে যা খেলা, আমাদের জন্যে তা মৃত্যুর কারণ’- সেই ব্যাঙ কথা বলতে পারত। নিশ্চয়ই কানেও শুনত। সমস্যা হলো, এডিস মশা মানুষের কথা বুঝতে পারে না। যদি বুঝতে পারত, তারা কথার দাপটে এতদিনে বাংলাদেশ ছেড়ে পালাত।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘এডিস মশা এত শক্তিশালী নয় যে মোকাবিলা করতে পারব না।’
বিএনপির মতো একটি রাজনৈতিক দলকে মোকাবিলা করে প্রায় অদৃশ্য করে দেয়া গেছে, সেখানে এডিস মশা মারা যাবে না কেন! বিএনপি মোকাবিলার বাহিনী আছে। লাঠি-গুলি-, মামলা-গায়েবি মামলা, রিমান্ড জেল… আছে। গুমের বিষয়টিও আলোচনায় আছে। মুশকিল হলো, এডিস মশাকে পিটানো যায় না, গুলি করা যায় না, গায়েবি মামলা বা রিমান্ড- জেল কিছুই করা যায় না। গুম তো করা যায়ই না। ফলে এডিস মশা নিধন করা যে কী কঠিনতম কাজ, ঢাকার মানুষ তা বুঝতে পারছেন না। এখন দেশের মানুষও তা বুঝতে পারছেন না। বুঝতে পারছে না গণমাধ্যমও। মেয়র-মন্ত্রীরা মানুষকে আতঙ্কিত হতে নিষেধ করেছেন। বলেছেন, আতঙ্ক ছড়ায় এমন সংবাদ প্রকাশ করবেন না। কিন্তু গণমাধ্যম মেয়র-মন্ত্রীদের বক্তব্য অনুসরণ না করে, প্রশ্ন করছেন। কেন শুধু শুধু প্রশ্ন? মেয়র-মন্ত্রীরা বলছেন, ডেঙ্গুতে মারা গেছে মাত্র ৪০ জন। অথচ গণমাধ্যম বলছে মারা যাওয়ার সংখ্যা ১৭১ জনের উপরে (২০ আগষ্ট পর্যন্ত)। দায় আছে ডাক্তারদেরও। তারাও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা জানিয়ে দিচ্ছেন সাংবাদিকদের।
কেন এত তথ্য অনুসন্ধান? ৪০ জন বললে আতঙ্ক কমে, ১৭১ জনের বেশি বললে আতঙ্ক বাড়ে। আতঙ্ক বাড়ানোর দরকারটা কী? মেয়র-মন্ত্রীদের কথা মেনে নিলেই হয়!
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডেঙ্গুতে মোট কতজন মারা গেছেন, প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। কেন এটা নিয়ে সংবাদ শিরোনাম করতে হবে? তিনি পরিবার নিয়ে মালয়েশিয়া বেড়াতে গিয়েছিলেন। ডেঙ্গু থেকে কয়েকদিন নিরাপদে থাকতে পারতেন। অথচ সাংবাদিকদের কারণে তা পারলেন না। বেড়ানো অসম্পূর্ণ রেখে তাকে চলে আসতে হলো। এখন আবার এত প্রশ্ন কেন? তিনি সারাদেশ ‘সুন্দরভাবে’ ম্যানেজ করছেন। এতেই তো সন্তুষ্ট থাকা উচিত। তা না, আবার প্রশ্ন!
তিনি সাংবাদিকদের ধমক দেবেন না, তো কে ধমক দেবেন? সাংবাদিকরা কি ভুলে গেছেন যে, তার বাবা কর্নেল (অব.) মালেক সাবেক স্বৈরাচার এরশাদের সময়ের ঢাকার মেয়র ছিলেন। সেই সময়ের ধমক নিপীড়ন নির্যাতনের কথা তো ভুলে যাওয়ার কথা নয়। বিশেষ করে সাংবাদিকদের। তাকে প্রশ্ন করলে ধমক খেতে হবে, এটাই বা ভুলে গেলেন কেন সাংবাদিকরা।
২.
উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘কাজ করতে গেলে, ভুল হবেই। ভুল হতে হতে এক সময় তো ঠিক হবে।’
‘অভিজ্ঞতা নেই, সততা আছে’- বলেছেন, আতিকুল ইসলাম।
একজন অনভিজ্ঞ-অদক্ষ মানুষ সততার সঙ্গে ভুল করছেন। তাকে সেই সুযোগ দিতে হবে না? ‘এক সময় তো ঠিক হবে’- ঠিক হওয়ার আগের সময়কালে কী আর এমন হবে! বড়জোর আরও কিছুসংখ্যক মানুষ মারা যাবেন। তা নিয়ে এত প্রশ্ন তোলার কী আছে? ১৭ কোটি মানুষের দেশে কয়েক লাখ মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত, দুই একশ মানুষের মৃত্যু- মোটেই চিন্তার বিষয় হওয়ার কথা নয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় কত মানুষ মারা যান, হৃদরোগে কত মানুষ মারা যান, সেসব খবর আমরা রাখি না।
অথচ ডেঙ্গু নিয়ে শুধু শুধু কথা বলা হচ্ছে।
কোনো মানুষই শুরুতে অভিজ্ঞ থাকেন না বা দক্ষ থাকেন না। মেয়র কাজের মাধ্যমে ভুল করতে করতেই অভিজ্ঞ-দক্ষ হয়ে উঠবেন। মেয়র আতিকুল ইসলাম অভিজ্ঞ-দক্ষ হচ্ছেন। তিনি যেদিন অভিজ্ঞ-দক্ষ হয়ে উঠবেন, সেদিন আর ডেঙ্গু থাকবে না, কেন যে মানুষ এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী হচ্ছে না! উল্টো প্রশ্ন তুলছেন, অনভিজ্ঞ-অদক্ষ কেউ মেয়র হবেন কেন? মেয়র তো বিত্তবানের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির পদ নয়। তিনিই হবেন মেয়র যিনি সারা জীবন কাজ করে অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা অর্জন করেছেন।
কী দরকার এসব কথা সামনে আনার?
৩.
সাঈদ খোকন জুলাই মাসের শুরুতে বলেছিলেন আতঙ্কিত হবেন না। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে চিন্তার কিছু নেই। মেডিকেল টিম প্রস্তুত আছে। ফোন করলেই বাড়িতে পৌঁছে যাবে। মেডিকেল টিমের সদস্যরা এডিস মশা বিষয়ে যে প্রায় কিছুই জানেন না, তা কি আর সাঈদ খোকন জানতেন? তাছাড়া এত মানুষকে এডিস মশা কামড়াবে, তাও হয়তো তিনি জানতেন না। তিনি হয়তো ধারণা করেছিলেন, তার হুংকারে এডিস মশা সীমান্ত অতিক্রম করে চলে যাবে। এডিস মশা যে মেয়র-মন্ত্রীদের হুংকারে ভয় পায় না, তা কী করে বুঝবেন? বিএনপি যেখানে ভয়ে ঘর থেকে বের হয় না, সেখানে এডিস মশা মানুষকে কামড়ানো অব্যাহত রাখল! অকার্যকর ওষুধকে কার্যকর বলে হুংকার দেয়ার পরও মশা ভয় পেল না। নতুন ওষুধ আসছে, এই হুংকারেও কর্ণপাত করল না মশা এডিস!
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওষুধ ছিটানোর মেশিন আছে নয়শ’র মতো। তার মধ্যে অর্ধেকসংখ্যক মেশিন নষ্ট। কী আশ্চর্যের বিষয়, চার সাড়ে চারশ মেশিন নষ্ট, এটা কেন সংবাদ শিরোনাম হবে? সাংবাদিকরা শুধু অর্ধেক গ্লাস খালি দেখেন। চার শ’র মতো মেশিন এখনো সচল আছে, এভাবেও তো দেখা যায়!
সিটি করপোরেশনের মেশিনগুলো ডিজেল মিশ্রিত ওষুধ ছিটানোর উপযোগী। নতুন নমুনা ওষুধ আনা হয়েছে পানি মিশ্রিত মেশিন উপযোগী। শ’চারেকের মধ্যে একশ’র মতো মেশিন পানি মিশ্রিত ওষুধও ছিটানো যায়। কিন্তু সাংবাদিকরা তা না বলে ‘ডিজেল মিশ্রিত’ ওষুধ আনা হয়েছে বলে প্রচার করছে। হ্যাঁ, নতুন ওষুধ হয়তো চারশ সচল মেশিনের মধ্যে তিনশ’টিতে কাজ করবে না, বাকি একশ’টিতে তো কাজ করবে। অথচ সংবাদ শিরোনামে এটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। নতুন ওষুধ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সাংবাদিকরা। সব কিছু নিয়ে প্রশ্ন তুললে মেয়র-মন্ত্রীরা কাজ করবেন কীভাবে? পরীক্ষায় একশ’টির মধ্যে আশিটি মশা মারা গেলে, সেটাকে বলা হয় কার্যকর ওষুধ। নতুন ওষুধে মশা মরছে ২৬টি। তাতে কী? আগের ওষুধে একটিও মরত না, এখনকার ওষুধে অন্তত ২৬টি মরছে তো! এটাকে ইতিবাচকভাবে দেখতেই হয়, তা না, শুধু শুধু প্রশ্ন।
৪.
মেয়র খোকন বললেন, ‘১১টি ওয়ার্ড ডেঙ্গুমুক্ত’ করে ফেলেছেন। তার এই চমকপ্রদ তথ্য নিয়েও সাংবাদিকরা প্রশ্ন তুললেন। শুধু প্রশ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেন না, রীতিমতো অনুসন্ধান করে প্রমাণ হাজির করলেন যে, ‘ডেঙ্গুমুক্ত’ ঘোষণা দেওয়া এলাকা ‘ডেঙ্গুযুক্ত’। কী দরকার এমন অনুসন্ধান? মেয়র বলেছেন, এতে জনমনে একটি স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি হতে পারত। কিন্তু সাংবাদিকরা সেই সুযোগ দিলেন না!
মেয়র-মন্ত্রী-নেতারা ‘গুজব’ নিয়ে খুবই চিন্তিত। কে বা কারা শুধু ‘গুজব’ ছড়ায়। ডেঙ্গু নিয়েও ‘গুজব’ ছড়াচ্ছে। তারকাদের সঙ্গে নিয়ে এক মন্ত্রী পরিষ্কার রাস্তায় ‘গুজব’ পরিষ্কার করছিলেন। নগর ঢাকার মানুষ এত বোকা যে, তারা কোনটা ‘গুজব’ আর কোনটা ‘সত্যি’ তাও বুঝতে পারেন না। ফলে দুই মেয়র নগরবাসীকে শাস্তি দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। দক্ষিণের মেয়র একজনকে সাত দিনের জেলদন্ড দিয়েছেন। উত্তরের মেয়র, বাড়িতে বাড়িতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন। মানুষ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নয় বলেই তো ডেঙ্গু, এখানে মেয়রদের কী করার আছে!
মেয়র-মন্ত্রীরা বলছেন ‘৪০’ নাগরিকরা বিশ্বাস করছেন ‘১৭১’। মেয়র-মন্ত্রীরা বলছেন ‘৫৪ হাজার’, নাগরিকরা বিশ্বাস করছেন ‘১০ বা ১৫ লাখ’।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার মশার উপর পিএইচডি করেছেন জাপান থেকে। তিনি বলছেন, ‘এডিস মশা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, ‘ডেঙ্গু মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে’। মেয়রদ্বয় বলছেন, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
আর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলছেন, ‘সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।’
কোনটা ‘গুজব’ আর কোনটা যে ‘সত্যি’!
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: [email protected]
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.