মঙ্গলবার , ২0 অগাস্ট ২0১৯, Current Time : 2:21 am




পরিস্থিতি থমথমে
ভারতের কাশ্মীর দু’ভাগে বিভক্ত

সাপ্তাহিক আজকাল : 10/08/2019

আজকাল ডেস্ক
১৯৪৭ সালে যে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা নিয়ে ভারতভুক্তিতে নাম লিখিয়েছিল কাশ্মীর, তা বাতিল করেছে মোদি সরকার। একই সঙ্গে জম্মু-কাশ্মীরকে দুই ভাগ করেছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। দুটি অংশই বিশেষ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা পাচ্ছে। এর মধ্যে জম্মু-কাশ্মীরের আলাদা বিধানসভা থাকবে, লাদাখ হবে বিধানসভাহীন। একই সঙ্গে কাশ্মীরের সীমানা নতুন করে গড়ার প্রস্তাব দিয়েছে বিজেপি।
এদিকে, এ ঘোষণার পর থেকে কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর যেন এক ভুতুড়ে শহওে পরিণত হয়েছে। হাট-বাজার দোকানপাট বন্ধ। স্কুল কলেজও বন্ধ। সড়কে লোকজনের দেখা নেই। সর্বত্রই শুধু ভারী অস্ত্র হাতে ভারতীয় সেনাবাহিনী, আধাসামরিক বাহিনীর টহল। রাস্তায় যানবাহন বলতেও সামরিক যানই সব। রোববার থেকে কার্যত অচল শ্রীনগর। টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট বন্ধ, উপত্যকাজুড়ে বিধিনিষেধ এবং অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনে শ্রীনগর দখলকৃত কোনও শহর বলেই মনে হচ্ছে।
সোমবার ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় অধিবেশনের শুরুতে ৩৭০ ধারা বাতিলের প্রস্তাব দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। অবশ্য এ প্রস্তাব পেশের আগেই ৩৭০ ধারা ও ৩৫ (এ) ধারা প্রত্যাহারের বিজ্ঞপ্তিতে সই করেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ।
রাজ্যসভায় অমিত বলেন, কাশ্মীরকে নতুন করে গড়তে বদ্ধপরিকর কেন্দ্র। এরপরই রাষ্ট্রপতির সই করা নির্দেশনামা, অর্থাৎ ৩৭০ ধারা সংশোধনী বিল পেশ করতে শুরু করেন তিনি। অমিত উঠে দাঁড়াতেই ক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন কংগ্রেসের গুলাম নবি আজাদ, তৃণমূল কংগ্রেসের ডেরেক ও’ব্রায়েনরা।
কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তুলে নেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানানোর পরপরই আরেক দফা ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিরোধী সংসদ সদস্যরা। এর মাঝেই সংবিধান ছেঁড়ার চেষ্টা করেন কাশ্মীরের দল পিডিপির দুই সংসদ সদস্য। তাদের সংসদের উচ্চকক্ষ থেকে বের করে দেন স্পিকার। বাইরে বেরিয়ে কুর্তা ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানান তারা।
তুমুল হট্টগোলের মধ্যেই সংশোধনী বিল পড়ে শোনান অমিত শাহ। বিলকে সমর্থন করে আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ বলেন, কাশ্মীরের উন্নয়নের জন্য এই ধারা বাতিল জরুরি ছিল। সংশোধনী প্রস্তাবে সমর্থন জানায় নবীন পট্টনায়েকের বিজেডি ও মায়াবতীর বসপা, কেজরিওয়ালের এএপি, শিবসেনা, এআইএডিএমকে, ওয়াইএসআরসিপি, বিপিএফ (অসম)।
সংশোধনীর বিরুদ্ধে ছিল নিতীশ কুমারের জেডিইউ, ডিএমকে, এমডিএমকে, কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস। নতুন আইনের ফলে এখন থেকে যে কোনো ভারতীয় কাশ্মীরে গিয়ে জমি কিনতে পারবেন। আগের আইনে কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারাই সেখানে বৈধভাবে জমি কিনতে পারতেন, সরকারি চাকরি করার সুযোগ পেতেন এবং সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।
কেন্দ্রের এ সিদ্ধান্তকে ভারতীয় গণতন্ত্রের ‘কালোদিন’ বলে উল্লেখ করেছেন জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি। রোববার রাত থেকেই মুফতিসহ রাজ্যটির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ, কংগ্রেস নেতা উসমান মজিদ, সিপিএম বিধায়ক এমওয়াই তারিগামিসহ বেশ কয়েক নেতাকে গৃহবন্দি করা হয়।
এর মধ্যে সোমবার মেহবুবা মুফতি ও ওমর আবদুল্লাহকে আটক করে হেফাজতে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাজধানী শ্রীনগর ও জম্মু অঞ্চলে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের পাশাপাশি সব স্কুল-কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
পুরো রাজ্যে মোবাইল, টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবা আংশিকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত সপ্তাহ থেকে কাশ্মীরে রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার সেনা। সোমবার আরও ৮ হাজার সিআরপিএফ পাঠানো হয়েছে শ্রীনগরে। ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে হাই অ্যালার্ট জারি করে তৎপর থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে কংগ্রেস নেতা গুলাম নবি আজাদ বলেন, ৩৭০ ধারা দিয়েই জম্মু-কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। জম্মু-কাশ্মীরকে মুক্ত রাখতে বহু মানুষের রক্তের দাম রয়েছে। আমরা দেশের সংবিধানের সঙ্গে আছি।
বিজেপি দেশের সংবিধানকে হত্যা করছে। টুইটারে ওমর আবদুল্লাহ লিখেছেন, একতরফা ও জঘন্য সিদ্ধান্ত। জম্মু-কাশ্মীরের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হল।
এই সংশোধনী বিল রাজ্যসভায় পাস হওয়ার পর লোকসভায় পেশ করা হবে। যেহেতু এখন সংসদ চলছে তাই উভয় কক্ষেই এ সংশোধনী বিল পাস করাতে হবে। নয়তো সংশোধিত ধারায় শুধু রাষ্ট্রপতির সই নিলেই চলত। এ ক্ষেত্রে যেহেতু রাষ্ট্রপতি আগেই সই করে দিয়েছেন তাই সংবিধান আর সংশোধন করতে হচ্ছে না।
এ অবস্থায় ৭ আগস্ট পর্যন্ত সংসদের উভয় কক্ষে উপস্থিত থাকার জন্য দলীয় সংসদ সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছে বিজেপি। ৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কাশ্মীর নিয়ে বিবৃতি দেবেন বলে জানা গেছে।
পাকিস্তানের সংসদেও সোমবার কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দেশটি ভারতের পদক্ষেপকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে এ নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যাবে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম। এ অবস্থায় ভারত-পাকিস্তান দু’দেশকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।
ভারতের পক্ষ থেকে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে জানানো হয়েছে। এদিকে, কাশ্মীর ইস্যুর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের শেয়ারবাজারেও। এদিন বিএসই সেনসেক্সের সূচক এক ধাক্কায় নেমে যায় ৬৫০ পয়েন্ট। নিফটি নেমে আসে ১০ হাজার ৮০০ পয়েন্টের নিচে।
এ ছাড়া সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে বাম রাজনৈতিক সংগঠনগুলো। সিপিএম, সিপিআই, ফরওয়ার্ড ব্লক, সিপিআইএমএল লিবারেশনের মতো একাধিক বাম দল সোমবার বিকালে নয়াদিল্লির সংসদ মার্গে বিক্ষোভ মিছিল করে। তাদের মতে, সরকারের সিদ্ধান্ত শুধু জাতীয় ঐক্যের ওপর বিরাট আঘাত নয়, এটা ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর সংগঠিত আক্রমণ।
এদিকে, রোববার থেকেই কার্যত অচল শ্রীনগর। টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট বন্ধ, উপত্যকাজুড়ে বিধিনিষেধ এবং অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনে শ্রীনগরে দখলকৃত কোনও শহর বলেই মনে হচ্ছে। স্থানীয় নাগরিকরা জরুরী প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছে না। জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, এটা অপ্রত্যাশিত। এমন পরিস্থিতিতে আমরা কখনও পড়িনি। এই বিষয়ে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। আমরা টিভি থেকে ঘটনা জেনেছি। আপাতত আমরা শুধু নির্দেশ পালন করছি।
বিবিসি জানিয়েছে, কাশ্মীরে এখন টেলিযোগাযোগ ও মিডিয়া ব্ল্যাকআউট চলছে। যার কারণে প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে না সংবাদ মাধ্যমেও। ভারত সরকারের সিদ্ধান্তে কাশ্মীরের জনগণ যেমন হতাশা তেমনি ক্ষোভে ফুঁসছে তারা। ফলে সেখানে বড় আকারের বিক্ষোভ হতে পরে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিবিসি বলছে, কাশ্মীর এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সামরিক উপস্থিতিপ্রবণ এলাকায়। কাশ্মীরে লক্ষাধিক অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে ভারত।
সংবাদকর্মীদের ওপরও চলছে নানা বিধিনিষেধ। বিবিসির আমির পীরজাদা অনেক কষ্টে লোকজনের সাথে কথা বলতে পেরেছেন। তাদের প্রায় সবার মধ্যেই ক্ষোভ ও ভারত সরকার বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এমনটা মনে করছেন।
বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ হতে পারে এই আশঙ্কায় স্থানীয় নেতাদের প্রায় সবাইকে গ্রেফতার করেছে ভারতীয় বাহিনী। তবে তারপরও কিছু জায়গায় বিক্ষোভ ও সেনাদের ওপর পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতে অবস্থান করছেন এমন কাশ্মীরীরা জানিয়েছেন, তারা তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না।
এম. টেক ডিগ্রিতে অধ্যয়নরত জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার শিক্ষার্থীর হাতে ছিল ৩৭০ ধারা বাতিলের খবর সম্পর্কিত একটি স্ক্রিনশট। তিনি বলেন, আমি পুলওয়ামাতে থাকি। জানি না আমার বাবা-মা এই খবর সম্পর্কে জানেন কিনা। স্যাটেলাইটের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। তাদের নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। শ্রীনগর পৌঁছে যদি কোনও গাড়ি না পাই তাহলে আমাকে হেঁটে পুলওয়ামা যেতে হবে।
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কিত এই শিক্ষার্থী। বলেন, পড়াশোনা শেষ করে কাশ্মীরের কোনও কলেজে শিক্ষকতার পরিকল্পনা ছিল আমার। কিন্তু ৩৭০ ধারা বাতিল হওয়ায় আমার এই সুযোগও শেষ। এমনিতেই কাশ্মীরে কোনও কর্মসংস্থান নেই। তারা মনে করছে, এভাবে আমাদের মন জয় করা যাবে। কিন্তু এটা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, তারা শুধু কাশ্মীর চায়, কাশ্মীরিদের নয়।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: [email protected]
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.