রবিবার, ১৮ অগাস্ট ২0১৯, Current Time : 3:25 am
  • হোম » এ সপ্তাহের খবর »
    দেড় ডজনেরও অধিক অভিযোগ দায়ের ॥ কম্পিউটার চুরির মামলায় হাজিরা ৬ আগষ্ট
    প্রতারক মোস্তাউরের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন ভুক্তভোগিরা




দেড় ডজনেরও অধিক অভিযোগ দায়ের ॥ কম্পিউটার চুরির মামলায় হাজিরা ৬ আগষ্ট
প্রতারক মোস্তাউরের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন ভুক্তভোগিরা

সাপ্তাহিক আজকাল : 13/07/2019

আজকাল রিপোর্ট
একের পর এক প্রতারণার জাল বিস্তার করে সহজ-সরল প্রবাসীদের ঠকানো এমআরটি নামে একটি সংস্থার কর্ণধার বাংলাদেশি মোস্তাউর রহমান কম্পিউটার চুরির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। মোস্তাউর গ্রেফতারের পর কমিউনিটিতে জানাজানি হওয়ায় আদালত এবং পুলিশের কাছে অন্তত ১৭ টি অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগীরা। কম্পিউটার চুরির মামলায় মোস্তাউর জামিনে এলেও তার পরবর্তী হাজিরার দিন আগামী ৬ আগষ্ট। তবে যেসব অভিযোগ দায়ের হয়েছে সেগুলো সংশ্লিষ্টরা তদন্ত করছেন।
শুক্রবার বিকেলে জ্যামাইকার হিলসাইড এভিনিউ এলাকার একটি দোকানে চুরি করা কম্পিউটারগুলো বিক্রির সময় ১০৭ পুলিশ প্রিসেন্টের অফিসার মোস্তাউরকে গ্রেফতার করেন। যে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা থেকে কম্পিউটারগুলো চুরি করা হয়েছে তার নাম ‘সাউথ এশিয়ান ফান্ড ফর এডুকেশন, স্কলারশিপ এ্যান্ড ট্রেনিং’ তথা স্যাফেস্ট। এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মাজেদা এ উদ্দিন।
মাজেদা উদ্দিন জানান, জ্যামাইকার ১৬৯-১৮ এর দ্বিতীয় তলায় মোস্তাউর রহমানের মালিকানাধীন এমআরটি গ্রুপ এলএলসি’র অফিসের একটি কক্ষ আমি ভাড়া নেই গত জানুয়ারি মাসে। ৬ মে উদ্বোধন করেছি স্যাফেস্ট’র অফিস। সেখানে উদ্যমী প্রবাসীদের কম্পিউটার শেখানোর পাশাপাশি ভাষাগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠার পরামর্শও দেয়া হয়। এ অবস্থায় ওই ভবনের মালিক মোস্তাউরের বিরুদ্ধে কুইন্স কোর্টে মামলা করেন ৮/৯ মাসের বকেয়া ভাড়া আদায়ের জন্য। ১৭ জুন আদালতের নির্দেশে নিউইয়র্ক সিটি মার্শাল রোনাল্ড ডব্লিউ পেজান্ট সেই ভবনে তালা লাগিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ ভবনের মালিক ছাড়া আর কেউ সেখানে ঢুকতে পারবেন না।
এ পরিস্থিতে মাজেদা উদ্দিন ঘাবড়ে যান। কারণ, তার অফিসে ১৭টি কম্পিউটার, নগদ অর্থসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ছিল। মাজেদা জানতে পারেন যে, মার্শাল কর্তৃক ওই ভবনে তালা লাগানোর আগেই মোস্তাউর সবকটি কম্পিউটার সরিয়ে ফেলেছেন।
গত ১ জুলাই মাজেদা নিশ্চিত হন যে, অন্তত ৪টি কম্পিউটার জ্যামাইকার একটি দোকানে বিক্রির পাঁয়তারা চলছে। ঘটনাটি পুলিশের দৃষ্টিতে দেয়ার পর ৫ জুলাই শুক্রবার অপরাহ্নে ওই দোকানে অভিযানের সময় পুলিশ মোস্তাউরকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেছে। দোকানদার মোহাম্মদ নাসের পুলিশকে জানান, মোস্তাউর কম্পিউটারগুলো বিক্রির জন্যে এনেছেন। সাথে সাথে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

এদিকে, কুইন্সের শামসুল হক, নিজাম উদ্দিন, মো. শফিক, ফরিদা ইয়াসমীন, আব্দুল কাদেরসহ ১২ জন অভিযোগ করেছেন যে, তার প্রকৃত নাম হচ্ছে মো. মুস্তাকুর রহমান। অর্থাৎ একেক সময় একেক নাম ধারণ করেছেন লোকটি এবং তারা সকলেই প্রতারিত হয়েছে। এরমধ্যে শামসুল হকের কাছ থেকে নেয়া হয়েছে ৫ হাজার ডলার। বিনিময়ে তাকে ওয়ার্ক পারমিট, সোস্যাল সিকিউরিটি নম্বর সংগ্রহ করে দেয়ার কথা। আরো ৯ হাজার ডলার চেয়েছেন কন্সট্রাকশন-ঠিকাদারের লাইসেন্স করে দেয়ার জন্য। কিন্তু তাকে ওয়ার্ক পারমিট সংগ্রহ করে দিতে পারেননি ওই ব্যক্তি। একটি সোস্যাল সিকিউরিটি নম্বর দিয়েছেন। সেটি নিয়ে হেলথ ইন্সুরেন্সের কার্ড করতে গিয়ে বিপাকে পড়ে ছিলেন শামসুল হক। কারণ, সেটি একটি ভুয়া সোস্যাল নম্বর ছিল।
শামসুল হক বলেন, মুস্তাকুর নিজেকে ইমিগ্রেশনের এটর্নী পরিচয় দিয়ে তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদন করিয়ে দেয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। এ জন্য মোটা অংকের অর্থের চুক্তি ছিল। সে মতে গত ১১ মার্চ ওই পরিমাণ অর্থ নেন প্রতারক মুস্তাকুর। অথচ মুস্তাকুর কোন এটর্নী যে নন সেটি নিশ্চিত হন শামসুল হক।
জ্যামাইকার মত ম্যানহাটানেও একটি কক্ষ ভাড়া নিয়েছিলেন মোস্তাউর। সেটির ভাড়া বাবদ দুটি চেক দেন। একটিও ভাঙাতে পারেননি ওই কক্ষের মালিক। এ ধরনের বেশক’টি চেক দিয়েছে নিউইয়র্কে বাংলা ভাষার পত্রিকাগুলোতে বিজ্ঞাপণের বিল বাবদ। প্রত্যেকেরই চেক বাউন্স হয় একাউন্টে কোন অর্থ না থাকায়।
কুমিল্লার বুড়িচংএর মুস্তাকুর ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের অকল্যান্ড সিটিতে ১৪৬০ ব্রডওয়েতে তার একটি অফিস ছিল। সেখানকার ভিজিটিং কার্ডে তাকে এমআরটি গ্রুপের এমডি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। শুধু তাই নয়, শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যে লেখা রয়েছে, কানাডা থেকে এমবিএ এবং এমএসএস করেছেন। ব্যবসা প্রশাসনে পিএইচডির ছাত্র ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে ক্যাম্পাসে। মুস্তাকুরের কাছে প্রতারিতরা উল্লেখ করেছেন যে, সবকিছুই মিথ্যা। কারণ, তার চাল-চলন এবং কথাবার্তায় কোনভাবেই উচ্চ শিক্ষিত বলে মনে হয়নি।
মোস্তাউর তথা মুস্তাকুর বলেন, ‘আমি এটর্নীশিপ করেছি কানাডায়।’ যুক্তরাষ্ট্রে কীভাবে আইনজীবী হিসেবে ব্যবসা করছেন-এ প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘নেটওয়ার্ক’-এ এটর্নীশিপ করেছি।’ অর্থাৎ উভয় তথ্যই সন্দেহের উর্দ্ধে নয়। নেটওয়ার্কে কোন ডিগ্রি অর্জনের বিধি নেই যুক্তরাষ্ট্রে। এছাড়া আইনজীবীর ব্যবসা করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের যে কোন অঙ্গরাজ্যে বার কাউন্সিলের মেম্বার হতে হবে। লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হয় যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে থেকে।
জানা গেছে, মোস্তাউর তথা মুস্তাকুর ১২ জুলাই নিউইয়র্ক থেকে ক্যালিফোর্নিায় চলে যাবার বিমান টিকিট ক্রয় করেছিলেন। অর্থাৎ এখানকার প্রবাসীদের সর্বনাশ করে কেটে পড়তে চেয়েছিলেন তিনি।
এদিকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তিনি কমিশনভিত্তিতে বেশ কয়েকজন দালালও নিয়োগ দেয়, যারা কখনো কখনো তারা নিজেদের এমআরটির বিজনেস পার্টনার হিসাবে পরিচয় দেন। যারা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন বিলাল চৌধুরী, মাজেদা উদ্দিন, আব্দুল কাদের শিশির, এস এম শাহাজাদা, বাফেলোর মাহমুদ, শামসুল হক, নিজাম উদ্দিন, ফরিদা ইয়াসমীন, যারা তার অফিসে কাজ করেছেন।
বিলাল চৌধুরী বলেন, প্রায় এক বছর আগের ঘটনা। আমি তাকে চিনতামও না। একদিন দুপুরে রিয়েলস্টেট এজেন্ট জনৈক বেলাল হোসেন আমাকে কল দিয়ে জ্যামাইকার একটি রেস্টুরেন্টে আসতে বলেন। তার কথা অনুযায়ী আমি ওই রেস্টুরেন্টে যাই। রেস্টুরেন্টে যাবার পর এম ডি রহমানের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেন। বলেন, বাংলাদেশ থেকে ব্যবসায়ী এসেছেন। তখন রহমান আমাকে বলে তিনি বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার বিজনেস পার্টনার। সে অনেক বড় বিজনেসম্যান। সিঙ্গাপুর থেকে তার টাকা আসে। আমি লংআইল্যান্ডে একটি বাড়ির কন্ট্রাক্ট সাইন করেছি, এই মুহূর্তে আমার ২৫ হাজার ডলার প্রয়োজন। তখন বেলাল চৌধুরী বলেন, আমি আপনাকে চিনি না, জানি না, আমি কীভাবে আপনাকে এত ডলার দেবো? তখনই রহমান পকেট থেকে চেক বই বের করেন। চেক বই বের করেই কয়েকদিন পরের তারিখ দিয়ে ২৫ হাজার ডলারের একটি চেক দেন।
বিলাল চৌধুরী বলেন, পরে আমি চেক জমা দিলে সেই চেক বাইন্স হয় এবং আমি জানতে পারি যে, এক বছর আগেই সে ওই ব্যাংক একাউন্ট বন্ধ করে দেয়। পরে আমি তার কাছে টাকা চাইতে গেলে, সে নানা ধরনের টালবাহানা শুরু করে। বেশ কয়েকবার তার সাথে বৈঠকও করি। উল্টো সে আমার বিরুদ্ধে পুলিশে রিপোর্ট করে। একদিন প্রিসেন্ট থেকে ডিটেকটিভ আমাকে কল করে। আমি থানায় যাই।
বিলাল চৌধুরী বলেন, আমি অর্থ ধার দিয়ে উল্টো হয়রানিতে পড়ি। এক সময় পুলিশের ডিটেকটিভ বিষয়টি বুঝতে পারে। কয়েকজনকে স্বাক্ষী রেখে সমঝোতাও হয় এবং আমাকে অর্থ দেয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সে আজ পর্যন্ত আমার অর্থ দেয়নি।
এদিকে এমডি এম রহমানের অফিসের সামনে গত ৮ জুলাই সন্ধ্যায় যারা প্রতারিত হয়েছেন এবং কম্যুনিটির সচেতন ব্যক্তিরা বিক্ষোভ করেছেন। বিক্ষোভে এ্যাসেম্বলীম্যান ডেভিট উইপ্রিন প্রতারক রহমানের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
অন্যদিকে দিন যতই যাচ্ছে। পত্রিকায় চটকদার বিজ্ঞাপণ দিয়ে মোস্তাউরের প্রতারণার ঘটনা আরো ফাঁস হচ্ছে।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: [email protected]
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.