মঙ্গলবার , ১৬ জুলাই ২0১৯, Current Time : 1:51 am




রমজানের রোজা এলো যেভাবে

সাপ্তাহিক আজকাল : 12/05/2019

রমজান শব্দটি আরবি (رمضان‎‎)। আরবি ধ্বনিতত্ত্ব অনুযায়ী অঞ্চলভেদে রমজান, রামাদান, রমজান উচ্চারিত হয়ে থাকে। রমজান হলো হিজরি বর্ষপঞ্জিকা অনুসারে নবম মাস। হিজরি বর্ষকে ইসলামি বর্ষ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

তবে মাস হিসেবে রমজান শব্দের প্রচলন ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগেও ছিলো। যেমন হজের মৌসুমকে যুল-হাজ্জাহ (জিলহজ) বলা হতো। সে-সময় বিভিন্ন বড় বড় ঘটনাকে স্মারক করে বর্ষ গণনার প্রচলন ছিলো। আরবি রমজান (رمضان‎‎) শব্দটি এসেছে আরবি মূল رمض (‘রমিদা’ বা ‘রমাদা’) থেকে। এর অর্থ প্রচণ্ড উত্তাপ কিংবা শুষ্কতা।

যেহেতু তখন রমজান উষ্ণ মৌসুমে আবর্তিত হতো, তাই এই নামকরণ হয়। পরবর্তী সময়ে যখন মাসটি হিজরি বর্ষের অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন রোজায় মানব স্বভাবের দিকে বিবেচনা করে এই নাম রেখে দেয়া হয়। অর্থাৎ যেহেতু রমজানে রোজা রাখা হয়, আর রোজায় খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকার ফলে মানুষের উদর শূন্য থাকে, আর শূন্য উদর বা খালিপেটের অবস্থাকে ‘রমদ’ বা আগুন-গরমের সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে—যেমন বলা হয় ‘ক্ষুধায় পেটে আগুন জ্বলছে’—তাই রোজার মাসকে এই নাম দেয়া হয়েছে।

রমজানের সঙ্গে রোজার সম্পর্ক

রমজানের সঙ্গে রোজার ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। হাসান বসরি রহ. বলেন, পূর্ববর্তী উম্মতদের ওপরও পূর্ণ একমাস রোজা ফরজ ছিলো। একটি মারফু’ হাদিসে রয়েছে, রাসুল সা. বলেছেন, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ ছিল। (তাফসিরে ইবনে কাসির, ২/৫০১)

আল্লামা আলুসি রহ. বলেন— কিতাবিদের ওপরও রমজানের রোজা ফরজ ছিল। তারা তা বর্জন করে বছরে একদিন উপবাস পালন করে, যেদিন ফেরাউন লোহিত সাগরে নিমজ্জিত হয়। পরবর্তী সময়ে ইহুদিদের দেখাদেখি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ও একই দিনে রোজা পালন করে। অবশ্য তারা এর সঙ্গে আগে-পিছে আরও দুইদিন সংযোজন করে নেয়। এভাবে নানা সময়ে বাড়াতে বাড়াতে তাদের রোজার সংখ্যা পঞ্চাশের কোটায় পৌঁছে। আবার গ্রীষ্মকালে রোজা রাখা কষ্টসাধ্য হলে তারা তা পরিবর্তন করে শীতের মৌসুমে নিয়ে আসে।

মুগাফ্ফাল ইবনে হানযালা রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুল সা. বলেন : খ্রিষ্টানদের ওপর রমজানের একমাস রোজা ফরজ হয়েছিল। পরবর্তীকালে তাদের জনৈক সম্রাট অসুস্থ হয়ে পড়লে তারা এ মর্মে মানত করে যে, আল্লাহ তাকে রোগমুক্ত করলে রোজার মেয়াদ আরো দশ দিন বাড়িয়ে দেব। এরপর পরবর্তী সম্রাটের আমলে গোশত খেতে গিয়ে তার মুখে রোগব্যধি দেখা দিলে তারা অতিরিক্ত সাতদিন রোজা মানত করে। পরে অন্য সম্রাট বলেন, তিন দিন আর ছাড়বো কেন? এবং তিনি এ-ও বলেন যে, এ রোজাগুলো আমরা বসন্তকালে পালন করবো। এভাবে রোজা ত্রিশের সংখ্যা অতিক্রম করে পঞ্চাশের কোটায় পৌঁছে যায়। (রুহুল মাআনি ও তাফসিরে রাযি, সুরা বাকারা ১৮৩ নং আয়াতের তাফসির)

৭৪৭ সালের একজন আরব লেখক আবু যানাদ জানান যে, উত্তর ইরাকের আল জাজিরা অঞ্চলে অন্তত একটি মান্দাইন সমাজ ইসলাম গ্রহণের আগেও রমজানে রোজা রাখত। যদিও আরবের বাহিরে রমজান মাস হিসাব করা হতো না, কিন্তু এই হিসাবটা ভিন্নজাতিক পঞ্জিকার সঙ্গে মিলিয়ে স্থির করা হয়েছে বলে বলা হয়।

ইসলামে রোজার আগমন

পূর্বেই আলোচিত হয়েছে—রমজানে রোজা ফরজ হওয়ার পূর্বে মুসলিমগণ আইয়ামে বিয ও আশুরার রোজা রাখত। তবে তা তাদের ওপর ফরজ ছিলো না, বরং সুন্নত ছিল। আইয়ামে বিয বা প্রতিমাসের মাঝের তিনদিন রোজা তো ইসলামপূর্ব সময়ের স্বভাব অনুসারে রাখা হতো।

মদিনায় হিজরতের পরে ইহুদিদের আশুরার রোজা পালন দেখে মহররম মাসে মুসলিমগণ তাদের চেয়েও একদিন বেশি রোজা রাখা শুরু করে। কিন্তু এসবই ছিলো ঐচ্ছিক, রাখার জন্য বাধ্য-বাধকতা ছিলো না। (শারহুন নাবাবি আলাল মুসলিম, ১/১৯৮, ইমাম নববি রহ., কিতাবুস সিয়াম, হাদিস ১১২৫)

ইসলামি আকিদা-বিশ্বাস যখন মুসলমানদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে গেঁথে গেল, নিয়মিত নামাজ আদায়ের মাধ্যমে তা বৃদ্ধি পেতে পেতে ভালোবাসার পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছলো এবং তাদের মধ্যে শরিয়তের হুকুম-আহকাম ও আল্লাহর নির্দেশ পালন করার এমন এক মন ও মেজাজ সৃষ্টি হয়ে গেল যে, মনে হচ্ছিলো তারা যেনো সে-সব হুকুম-আহকামের অপেক্ষায় থাকেন, তখন আল্লাহ তাআলা রোজার হুকুম নাজিল করলেন।

এটি হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষের ঘটনা। অর্থাৎ নবুয়তের ১৫তম বছরে এসে রোজার বিধান অবতীর্ণ হয়। প্রথমে নাজিল হয় এই আয়াত— হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেনো তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পারো। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)

তবে প্রথমেই মাসব্যাপী রোজা ফরজ হয় নি। বরং হাতে গোনা কয়েকদিন রোজা ফরজ ছিলো, যেনো তা কঠিন মনে না হয়। (তাফসিরে তাবারি, সংশ্লিষ্ট আয়াতের তাফসির, পৃষ্ঠা ৪১৩)

এবং সে-কারণেই নাজিল হয়— গণনার কয়েকটি দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুখ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকিনকে খাদ্যদান করবে। যে-ব্যক্তি খুশীর সঙ্গে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি রোজা রাখো, তবে তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পারো। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৪)

তবে ফরজ হলেও না-রেখে পরিবর্তে মিসকিনদের খাওয়ানোর স্বাধীনতা তখনও ছিল।

শরিয়ত বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ইসলামের শুরুতে মুসলমানদেরকে রোজা ও ফিদিয়া এর যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। এ ব্যাপারে তারা স্বাধীন ছিলেন। যেমন মাআজ ইবনে জাবাল রা. বলেন, প্রথম দিকে যার ইচ্ছা রাখতো, যার ইচ্ছা না রেখে মিসকিনকে খাদ্য দান করত; কিন্তু পরে এই সুযোগ রহিত হয়ে যায়।

এরপরে নাজিল হয় রমজানে রোজা রাখার অপরিহার্য বিধান— রমজান মাসই হলো সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোজা রাখবে। (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৫)

আয়াত নাযিল করে রোজা সকলের জন্য আবশ্যক করে প্রদত্ত স্বাধীনতাকে রহিত করা হয়েছে। উম্মাহর সকল ওলামায়ে কেরাম একমত যে, এ-আয়াত প্রমাণ করে, রমজান মাসের রোজা ফরজ। যদি কোনও ব্যক্তি শরিয়ত অনুমোদিত কারণ ছাড়া রোজা না-রাখে, তাহলে সে কবিরা গুনাহ তথা মহাপাপের ভাগিদার হবে।

এভাবে রোজা ফরজ করার হিকমত হচ্ছে, বিধান প্রবর্তনে উম্মতের প্রতি সহজীকরণ ও ক্রমান্বয়িক নীতি পরিগ্রহণ। কারণ সিয়াম একটি কষ্টসাধ্য ইবাদত। মুসলমানরা আগে থেকে এ ব্যাপারে খুব একটা অভ্যস্ত ছিলেন না। যদি সূচনাতেই এটি তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হতো, তাহলে ব্যাপারটি তাদের জন্য কঠিন হয়ে যেতো। তাই প্রথমে রোজা ও ফিদয়ার মাঝে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে।

অত:পর আস্তে আস্তে তাদের ইয়াকিন মজবুত হয়েছে, মানসিক অবস্থা স্থিরতা লাভ করেছে এবং ধীরে ধীরে রোজার অভ্যাস গড়ে উঠেছে। তখন স্বাধীনতা উঠিয়ে নিয়ে কেবল রোজাকে আবশ্যিক করা হয়েছে। কঠিন ও কষ্টসাধ্য বিধি-বিধানের ব্যাপারে ইসলামে এর বহু নজির বিদ্যমান। একে পরিভাষায় ক্রমান্বয়ে প্রবর্তণ বলা হয়। (নবিয়ে রহমত, সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি)
সূত্র : যুগান্তর



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: [email protected]
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.