শনিবার, ২৫ মে ২0১৯, Current Time : 1:46 am




রোহিঙ্গা ইস্যুতে অবস্থান পাল্টায়নি চীন ও রাশিয়া

সাপ্তাহিক আজকাল : 12/05/2019

বাংলাদেশের ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পরও রোহিঙ্গা ইস্যুতে অবস্থান পাল্টায়নি জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাধর রাষ্ট্র চীন ও রাশিয়া। মিয়ানমারের প্রতি সহানুভূশীল এই দুই পরাশক্তি রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা নিরসনে বাংলাদেশকে দ্বিপক্ষীয়ভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার চাপ দিয়ে যাচ্ছে। ইস্যুটির আন্তর্জাতিকীকরন চায় না বাংলাদেশেরও বন্ধু রাষ্ট্র চীন ও রাশিয়া।

এদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে মিয়ানমারের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেও কোনো সুফল পাচ্ছে না বাংলাদেশ। বাংলাদেশের কোনো প্রস্তাবেই কার্যকর কোনো সাড়া দিচ্ছে না প্রতিবেশী দেশটি। বরং নানা অজুহাতে ইস্যুটিকে ঝুলিয়ে রেখে দিন পার করে দিচ্ছে মিয়ানমার।

এ ব্যাপারে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির শনিবার সাথে আলাপকালে বলেন, চীন ও রাশিয়ার ইচ্ছানুযায়ী রোহিঙ্গা শরণার্থী সঙ্কট নিরসনে মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয়কভাবেই কাজ করে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এমওইউ বাস্তবায়নের জন্য দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব মর্যাদার কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে যৌথ কার্যকরী গ্রুপ (জেডাব্লিউজি) গঠন করা হয়েছে। জেডাব্লিউজির বৈঠক কয়েক দফায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন দ্বিপক্ষীয় এই কর্মকান্ডকে কিভাবে ফলপ্রসু করা যায় – সেটাই বিবেচ্য বিষয়।

তিনি বলেন, একথা পরিষ্কার যে চীন বা রাশিয়ার সহযোগিতা ছাড়া রোহিঙ্গা সঙ্কটের সুরাহা সম্ভব না। এখন নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাধর দুই শক্তিকে সম্পৃক্ত করার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। দুই পরাশক্তিই বলুক কিভাবে দ্বিপক্ষীয়ভাবে শরণার্থী সমস্যার সমাধান করবে বাংলাদেশ। এ জন্য কূটনৈতিক দূরদর্শীতা কাজে লাগাতে হবে।

এদিকে রাখাইন রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত জিয়াং জু’র একটি বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। গত বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি বলেছেন, রাখাইন রাজ্যে দারিদ্র বিমোচনের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলা করতে চায় চীন। আর এ জন্য পিছিয়ে পড়া রাজ্যটির উন্নয়ন প্রয়োজন। বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোরের মাধ্যমে রাখাইন রাজ্যকে উন্নয়নের আওতায় আনা যায়।

প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান নয় বলে চীনা রাষ্ট্রদূত মন্তব্য করেন।

রোহিঙ্গা মুসলিমদের দুর্ভোগের সাথে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগকে এক সমান করে দেখানো মানবাধিকারের প্রতি অসম্মান বলে মনে করেছেন বাংলাদেশের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবর্তন বিষয়ক কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম। বেনার নিউজের সাথে আলাপকালে তিনি বলেছেন, শুধু উন্নয়নের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান হবে না। এক্ষেত্রে মিয়ানমার সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকার দেয়া না হলে এ সঙ্কটের শেষ হবে না।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রধান মেজর জেনারেল (অব:) এএনএম মুনিরুজ্জামান বলেছেন, প্রস্তাবিত বিসিআইএম করিডোর যাবে রাখাইন রাজ্যের ভিতর দিয়ে। দৃশ্যত চীন রোহিঙ্গা সঙ্কটকে দেখছে তাদের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায়। রাখাইনের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে চীন। তারা সেখানে একটি জ্বালানী টার্মিনাল নির্মাণ করছে। তিনি বলেন, বিসিআইএম করিডোর বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হলো রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধান। কিন্তু শুধু উন্নয়নই রোহিঙ্গা সঙ্কটের একমাত্র কৌশল হতে পারে না।

বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদরা চীনা কূটনীতিকের মন্তব্যকে অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, উন্নয়নের নিরীখে মানবাধিকারকে অবজ্ঞা করে চীন রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান দেখছে।

এ ব্যাপারে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেছেন, চীনের রাষ্ট্রদূত রাখাইনে উন্নয়নের মাধ্যমে সঙ্কটের সমাধান করতে চান- সেটা ভাল কথা। কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদার সাথে প্রত্যাবাসন এবং রাখাইনে তাদের বসবাসের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তিনি বলেন, বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোরের মাধ্যমে চীন রোহিঙ্গা সঙ্কটের টেকসই সমাধান করতে চাইলে বাংলাদেশের আপত্তি থাকার কথা না। আমরাও চাই বিসিআইএম সফল হোক। কিন্তু রাখাইনের অস্থিরতা বজায় রেখে বিসিআইএম সফল করা সম্ভব না। শরণার্থী সঙ্কট সুরাহায় আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে সবচেয়ে ভালভাবে কাজে লাগানোর সুযোগগুলো আমাদের নিতে হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী দুই দেশের ১৫ জন করে সদস্য নিয়ে জেডাব্লিউজি গঠিত হয়েছে। গত বছর ৩০ অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠিত জেডাব্লিউজির তৃতীয় বৈঠকে মধ্য নভেম্বর থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম দফায় যাচাই-বাছাই করা দুই হাজার ২৬০ জন রোহিঙ্গা রাখাইনে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রত্যাবাসন শুরুর নির্ধারিত দিন অর্থাৎ ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে যাওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ফলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ভেস্তে যায়।

নেপিডোতে গত ৩০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত জেডাব্লিউজির চতুর্থ বৈঠকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি (আইডিপি) ক্যাম্পগুলো বন্ধ এবং সীমান্তের জিরো লাইনে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে আনান কমিশনের দেয়া সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে সরকার। মিয়ানমারের সাথে সই হওয়া এমওইউ অনুযায়ী যৌক্তিক সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।

জেডাব্লিইজি বৈঠকে অংশ নেয়া একজন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের সাথে আলোচনায় প্রত্যাবাসনের জন্য আস্থা তৈরীতে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নেতাদের নিয়ে একটি প্রতিনিধি দলকে রাখাইনে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল মিয়ানমারের বন্ধু রাষ্ট্র জাপান। জাপানের প্রস্তাব অনুযায়ী, অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় মিয়ানমার যে সব পদক্ষেপ নিয়েছে, রোহিঙ্গা নেতারা তা দেখে আশ্বাস্ত হতে পারেন। এরপর তারা কক্সবাজার ফিরে এসে অন্যান্য রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে উৎসাহিত করতে পারেন। জাপানের দেয়া প্রস্তাবটি জেডাব্লিইজি বৈঠকে উত্থাপন করলে মিয়ানমার হ্যাঁ বা না – কোনো ধরনের সাড়া দেয়নি।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের প্রতিনিধিদের নিয়ে বড় আকারের সম্মেলন আয়োজনে প্রস্তাব দেয়া হয়। প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমার পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, তাদের পক্ষে এ ধরনের আয়োজন করা সম্ভব না।

২০১৭ সালে আগস্টে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী নজীরবিহীন নৃশংসতা চালালে সাত লাখের বেশী রোহিঙ্গা রাখাইন থেকে পালিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়। একই বছর নভেম্বরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে এমওইউ সই হয়। এমওইউ অনুযায়ী ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মিয়ানমারের নানারকম তালবাহানায় আজ পর্যন্ত তালিকাভুক্ত একজন রোহিঙ্গাও কক্সবাজার থেকে রাখাইনে ফিরে যায়নি। -নয়াদিগন্ত



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: [email protected]
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.