বুধবার , ২২ মে ২0১৯, Current Time : 3:22 am




ভাষা দিবসে ভাষাহীন!

সাপ্তাহিক আজকাল : 02/03/2019


মিলা হোসেন :
যখন চোখের সামনে দেখছিলাম দাউ দাউ আগুন, বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, এটা আমার সেই পুরনো ঢাকা। আমার স্মৃতির শহর। পুরনো ঢাকার এই রাস্তায় আমি কত হেঁটেছি। বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ঘুরেছি, খেয়েছি।
পুরনো ঢাকার মেয়ে আমি। আজিমপুরের। দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকায় বসবাস করলেও মনের মাঝে বাস করে প্রিয় ঢাকা শহর। চকবাজার আমার খুব পরিচিত জায়গা। কখনো বিরানী খেতে, কখনো নুরানী লাচ্ছির জন্য, কখনো রোজার মাসে ইফতারি কিনতে কত গেছি এই চকবাজার। কত মজার স্মৃতি আছে এই মায়াভরা চকবাজার ঘিরে।
আজ আমার সেই চকবাজার চোখের সামনে (মোবাইলের পর্দায়) পুড়ে ছারখার হয়ে গেল। শুনছি, গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুন লেগেছিল। অগ্নিকান্ডের লেলিহান শিখা সময় দেয়নি কাউকে। ছারখার করে দিয়েছে সবকিছু। ছিনিয়ে নিয়ে গেছে ৭৮জনেরও বেশি প্রাণ। কোনো কোনো গণমাধ্যম বলছে, নিহতের সংখ্যা ৭৮। ফায়ার ব্রিগেডের অফিশিয়াল ব্রিফিং বলছে ৬৭। আর নিউইয়র্ক টাইমসের হিসেবে ১১০ জন। অনেক মানুষ এখনো নিখোঁজ। নিহতের প্রকৃত সংখ্যা জানা হয়তো এতো তাড়াতাড়ি সম্ভব হবে না। আবার হয়তো কোনোদিনই জানা যাবে না।
চকবাজারে অগ্নিকান্ডের পর থেকে নিখোঁজ ফাতেমাতুজ জোহরা বৃষ্টি ও রেহনুমা দোলা। ২০ ফেব্রুয়ারি শিল্পকলা একাডেমিতে কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান থেকে ফিরছিল দুই বান্ধবী। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৃষ্টির সর্বশেষ কথা হয় রাত দশটার কিছু পর। চকবাজারে আগুন লাগে সাড়ে দশটার পর। এরপর থেকে বৃষ্টি ও দোলা নিখোঁজ। তাদের মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।
ফোন বন্ধ পেয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় নিখোঁজ দুজনের মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে জানা যায়, অগ্নিকান্ডের ঘটনাস্থলের পাশেই ছিল তাদের অবস্থান। এ তথ্য জানার পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ করেও তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এক সময় ঢাকায় আবৃত্তি সংগঠন করেছি আমি। নাটক করে, আবৃত্তি করে কত দিন রাত হয়ে গেছে বাড়ি ফিরতে। এই বৃষ্টি-দোলার মতোই। তাই দুই বান্ধবীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় বার বার মনে হচ্ছে, আমি যেন স্বজন হারিয়েছি।
এমন আরও কত স্বপ্ন আগুন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। গর্ভধারিণী স্ত্রী নামতে পারেনি তাই স্বামীও নামেনি বউ-বাচ্চা ছেড়ে। আমার চোখের পানি অশ্রু হয়ে ঝরেছে যখন শুনেছি, চার বন্ধু হোটেলে আড্ডা দিতে গিয়ে পোড়া লাশ হয়েছে। বার বার চমকে উঠছি আমি। এরা তো আমারই কাছের কেউ হতে পারতো?
মা যখন বিলাপ করে ছেলের এক টুকরো শরীর চাচ্ছিলো, আর সহ্য করতে পারিনি। মোবাইলের পর্দা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছি। এ দেখা যায় না।
কেন বারবার এই নির্মমতা? সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন ফায়ার ফাইটাররা। ধারে কাছে নাকি পানির অভাব ছিল। বুড়িগঙ্গার পাশেই তো পুরনো ঢাকা। পানি থাকবে না কেন? শুনেছি, রাস্তা চিকন বলে আগুন নেভানোর গাড়ি ঢুকতে পারেনি। আকাশ থেকে কি কিছু করা যেত? আমি এক্সপার্ট না, মাথায় যা আসছে তাই লিখছি। আমি আর ভাবতে পারছি না। ভাষা শহীদ দিবসে আমি যে আজ ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। শান্তি পাক তারা, যারা কিছু বোঝার আগেই চলে গেলো আমাদের ভাষাহীন করে!

লেখক: অভিনয়শিল্পী ও লাক্স-আনন্দধারা ফটো সুন্দরী; ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, আজকাল, নিউইয়র্ক।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: [email protected]
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.